একুশের চেতনা কি তবে ম্লান হচ্ছে?

একুশে ফেব্রুয়ারি ভোরে আমরা সাধারণত যেসব ছবি দেখতে অভ্যস্ত তা হল খালি পায়ে সারি বেঁধে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া সাদা কাপড়ে মোড়া শিশুরা আর মাইকে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”র সুর। কিন্তু ২০২৫ সালের একুশের প্রাক্কালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুণবতী ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাসের ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাত দুটার দিকে অজ্ঞাত একদল লোক কলেজ চত্বরে ঢুকে স্থাপিত শহীদ মিনারের তিনটি স্তম্ভের মধ্যে দুটি ভেঙে ফেলে মেঝের টাইলস আর ঘেরা দেয়াল ভাঙচুর করে চলে যায়; পরদিন সকালে ছাত্র শিক্ষক আর এলাকাবাসী ভাঙা স্তম্ভের পাথর ছড়িয়ে থাকতে দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। স্থানীয় গণমাধ্যম জানায় ঘটনার ভিডিও দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে ক্ষোভের ঝড় ওঠে আর অনেকে এই আঘাতকে শুধু একটি স্থাপনার ভাঙচুর নয় বরং একুশের চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীকের ওপর সরাসরি হামলা হিসেবে দেখেন।
 
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রথমে এটিকে “দুর্বৃত্তদের বিচ্ছিন্ন কাণ্ড” বলে মন্তব্য করলেও কয়েক দিনের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রশাসন তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কারা এর পেছনে ছিল তা খতিয়ে দেখতে; মিডিয়ায় আসা খবরে ইঙ্গিত পাওয়া যায় এর পেছনে থাকতে পারে দুটি ভিন্ন ধারা একদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আরেকদিকে এমন কিছু গোষ্ঠীর মানসিকতা যারা মুক্তিযুদ্ধ ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে “ভুল আদর্শ” হিসেবে দেখাতে চায়। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ শেখ মুজিবের ভাস্কর্য ভাষা আন্দোলন স্মারক এমনকি কলেজ ক্যাম্পাসের ছোট ছোট শহীদ মিনারে পর্যন্ত ভাঙচুর বা বিকৃত করার ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ পায় যা মিলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয় এটি কোনো একক বিচ্ছিন্নতা নয় বরং ধারাবাহিকভাবে জাতীয় প্রতীকের ওপর আক্রমণের অংশ।
 
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে শহীদ মিনারের ওপর এই আক্রমণকে দেখি শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ধর্মীয় উগ্রতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নয় বরং স্মৃতি আর অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণের লড়াই হিসেবে। শহীদ মিনার আমাদের কাছে কেবল ১৯৫২ সালের ভাষা সংগ্রামের স্মারক নয় বরং একটি প্রতিশ্রুতি যে এই ভূখণ্ডে ভাষা সংস্কৃতি চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করা হবে আজকের ক্ষমতাসীন বা আগামী শাসকের রং যাই হোক। যখন দেখি একদিকে ভাষা শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙা হচ্ছে আর অন্যদিকে পাঠ্যপুস্তক থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা মুক্তিযুদ্ধ বা সংখ্যালঘুর ইতিহাসের অংশ কেটে ফেলার চাপ বাড়ছে তখন মনে হয় ভাষা আন্দোলনের “আমার ভাইয়ের রক্ত” যেন ধীরে ধীরে দলীয় আর মতাদর্শিক পাওনা আদায়ের হিসাবের মধ্যে গলতে বসেছে। একুশের চেতনা ম্লান হচ্ছে কি না তার জবাব তাই পাথরের স্তম্ভ ভেঙেছে কারা সে প্রশ্নের চেয়েও বড় আমাদের নিজেদের কাছে যে প্রশ্ন আমরা কি এখনও এই প্রতীকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বহুভাষিক মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্নটাকে গুরুত্ব দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চাই নাকি কেবল কোনো এক পক্ষের বিজয়ের স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত করতে চাই।

25 Responses

  1. একুশের চেতনা কি তবে ম্লান হচ্ছে? প্রশ্নটা আসলে খুব জরুরি। বাংলা ভাষার জন্য যে প্রজন্ম রক্ত দিয়েছিল, আজ সেই ভাষাই সরকারি দফতর, আদালত, শিক্ষায় অবহেলিত। ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেমেয়েরা বাংলা লিখতেই পারে না এটা কি চেতনা বাঁচিয়ে রাখার উদাহরণ?

  2. তুই আবারও সেক্যুলার এজেন্ডা নিয়ে হাজির। একুশ মানে শুধু ভাষা না, ইসলাম রক্ষার লড়াইও ছিল পাকিস্তানি শাসকরা আরবি চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তুই একুশকে সেক্যুলার চেতনা বানিয়ে আল্লাহ, কুরআন, ইসলামকে একুশ থেকে মুছে ফেলতে চাস।

  3. তুমি ঠিকই ধরেছ একুশ এখন আর জীবন্ত আন্দোলন না, হয়ে গেছে আনুষ্ঠানিকতা। প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে ফুল, গান সবই আছে, কিন্তু বাস্তবে বাংলা ভাষার মর্যাদা কোথায়? সুপ্রিম কোর্টে রায় ইংরেজিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ইংরেজিতে, চাকরির ইন্টারভিউ ইংরেজিতে।

  4. তুই সব সময় ভাষার অধিকার নিয়ে কথা বলিস, কিন্তু আরবি ভাষা শেখা, কুরআন পড়া এসবকে তুই মৌলবাদ বলে গালি দিস। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে আরবি শিক্ষা বাড়ানো কি একুশের চেতনার বিরোধী? তোর কাছে শুধু পশ্চিমা ইংরেজি মাধ্যমই সভ্যতা।

  5. ভালো লাগল যে তুমি language rights আর cultural identity-র বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও এনেছ UNESCO, International Mother Language Day এসব বাংলাদেশের অবদান, কিন্তু আমরা নিজেরাই নিজের ভাষাকে neglect করছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টেও দেখা যায়, বাংলা মাধ্যম স্কুল কমছে, ইংরেজি বাড়ছে।

  6. আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, কুরআন আরবি ভাষায় নাজিল হয়েছে কারণ সেটাই সবচেয়ে সুন্দর ভাষা। বাংলা ভাষা ভালো, কিন্তু আরবিকে অবহেলা করে শুধু বাংলা র দাবি করাটা ঈমানের দুর্বলতা। তুই একুশকে ইসলাম বিরোধী বানাতে চাস।

  7. তুমি যেভাবে class divide-এর কথা এনেছ ধনী পরিবারের বাচ্চারা ইংরেজি মাধ্যমে, গরিবের বাচ্চা বাংলা মাধ্যমে এটা শুধু ভাষার সমস্যা না, সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতীক। যারা বাংলা মাধ্যমে পড়ে, তারা চাকরি পায় কম, বেতন কম এটা একুশের চেতনার সাথে মিলে না।

  8. তুই বারবার শ্রেণি বৈষম্য আনিস, কিন্তু পুঁজিবাদ, ইংরেজি মাধ্যম এসবের পেছনে পশ্চিমা প্রভাব আছে; সেটা নিয়ে তুই চুপ। মুসলিম উম্মাহ এক ভাষায় (আরবি) ঐক্যবদ্ধ হতে পারত, কিন্তু তুমরা সেক্যুলাররা জাতীয়তাবাদের নামে সেই ঐক্য ভেঙে দিয়েছ।

  9. মো. ফারহানুল ইসলাম says:

    ভালো হয়েছে তুমি সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলা ভাষার অবস্থার কথাও এনেছ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে তরুণরা বাংলিশ লেখে, ইংরেজি ক্যাপশন দেয়; অনেকে বাংলায় কমেন্ট করলে আনপড় ভাবে। এই মানসিকতাই একুশের চেতনা ম্লান করে দিচ্ছে।

  10. তোর লেখা পড়ে মনে হয়, একুশ মানে শুধু বাংলা ভাষা, আর কিছু না। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদরা কি শুধু ভাষার জন্যই মরেছিল, নাকি স্বাধীনতা, ইসলাম, সংস্কৃতি সবকিছুর জন্যই? তুই একুশকে শুধু ভাষা দিবস বানিয়ে সংকীর্ণ করে ফেলেছিস।

  11. মো. সোলায়মান হোসেন says:

    তুমি স্পষ্ট দেখিয়েছ সরকারি স্লোগানে আমার ভাষা, আমার গর্ব , কিন্তু বাস্তবে সরকারি ওয়েবসাইটে বাংলা কনটেন্ট কম, আদালতের রায় ইংরেজিতে, এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রও ইংরেজিতে বেশি গুরুত্ব পায়। এটা তো সরাসরি বিরোধিতা।

  12. তুই পশ্চিমা মডেল দিয়ে সব কিছু বিচার করিস। ফ্রান্সে ফ্রেঞ্চ, স্পেনে স্প্যানিশ তারা রক্ষা করে, ভালো। কিন্তু আমরা যদি আরবি বাড়াই, তাহলে মৌলবাদ ; বাংলা বাড়াই, তাহলে জাতীয়তাবাদ । তোর আসল সমস্যা ইসলামের প্রভাব কমানো।

  13. ভালো লাগল যে তুমি শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলার অবস্থান নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য এনেছ প্রাইমারি থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত ইংরেজি মাধ্যমের দাপট, বাংলা মাধ্যম শিক্ষার্থীদের হীনমন্যতা, এমনকি বাংলা বিভাগেও ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে পড়ানো হয়।

  14. কিন্তু একটা কথা তুই বলিস না একুশের শহীদদের অনেকেই ছিল ধার্মিক মুসলিম। তারা পাকিস্তানের ইসলামি শাসন চেয়েছিল, শুধু উর্দু চাপানোর বিরুদ্ধে ছিল। তুই তাদের ইতিহাসকে সেক্যুলার বানিয়ে নিজের মতো সাজাস, এটা ইতিহাস বিকৃতি।

  15. তুমি ঠিকই বলেছ একুশ শুধু ২১ ফেব্রুয়ারিতে ফুল দেওয়া না, বরং সারাবছর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে বাংলা ভাষা রক্ষার কোনো জাতীয় কর্মসূচি নেই, নীতিমালা নেই; সব কিছুই আবেগ আর আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ।

  16. একুশের চেতনা কি তবে ম্লান হচ্ছে? প্রশ্নটা আজকাল আরও বেশি তিক্ত লাগে, যখন ভাষা শহীদের দিনেও বইমেলায় সেন্সরশিপ, লেখক প্রকাশকের ওপর হামলা, আর ক্যাম্পাসে ভিন্ন ভাষা বা কণ্ঠের জন্য হুমকি দেখা যায়।

  17. তুই হিন্দু নাস্তিক, তোর কাছে একুশ মানে শুধু সেক্যুলারিজম আর বামপন্থা। কিন্তু এই আন্দোলনে মাদ্রাসার ছাত্র, আলেম, মুসলমান জনতাও ছিল তাদের ভূমিকা গায়েব করে একুশকে শুধু তোর মতাদর্শের ব্র্যান্ড বানাতে চাইছিস।

  18. তুমি ভালোভাবে দেখিয়েছ, একুশ আজ শুধু ফুল দেওয়া, কবিতা শোনা আর সেলফি তোলার দিনে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে; ভাষা, জাতিগত পরিচয়, আদিবাসী ভাষা, রোহিঙ্গা বা হিন্দু উর্দুভাষীদের অধিকার এসব প্রশ্ন একুশের বক্তৃতামঞ্চে খুব কমই আসে।

  19. একুশের নাম নিয়ে আজকাল অনেকে ইসলামের বিরুদ্ধেও কথা বলে, ধর্মনিরপেক্ষতা র অজুহাতে মুসলিম আইডেন্টিটিকেই টার্গেট করে। তুইও সেই লাইনে হাঁটিস ভাষা আন্দোলনকে শুধু ধর্মহীন জাতীয়তাবাদের গল্প বানাতে চাইছিস।

  20. তুমি যে পয়েন্টটা এনেছ ইংরেজি নির্ভর এলিট সংস্কৃতি আর কর্পোরেট জগতে বাংলাকে এখনও নিম্নস্তরের ভাষা হিসেবে দেখা হয় এটা একুশের মূল চেতনার সাথেই সাংঘর্ষিক। ভাষা আন্দোলন ছিল শ্রেণি ও শাসন বিরোধী লড়াই, শুধু উৎসব না।

  21. তোর একুশ মানে মুসলিম আইডেন্টিটিকে পাতলা করা, ইসলামকে শুধু ‘কালচার’ বানিয়ে ফেলা। কিন্তু বাস্তবে ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে মুসলমান বাঙালিরই রাজনৈতিক জাগরণ ছিল; তোর সেক্যুলার ন্যারেটিভ আল্লাহর দৃষ্টিতে কোনো মূল্যই পাবে না।

  22. তুমি ঠিকই বলেছ, একুশের গল্প বলতে গিয়ে আমরা সবসময় ঢাকার ছাত্র নেতাদের নাম করি, কিন্তু পাহাড়ি, আদিবাসী, উর্দুভাষী গরিব মানুষ যারা ভাষা ও মাটির লড়াইয়ে ছিল তাদের ইতিহাস দ্রুত মুছে যাচ্ছে। একুশের চেতনা ম্লান মানে এই বহুত্বও হারিয়ে যাওয়া।

  23. তুই একুশের নামে আজকে এলজিবিটি, নাস্তিক ব্লগার, সবকিছুর ফ্ল্যাগ একসাথে ওড়াতে চাইছিস। ভাষা আন্দোলনের শহীদরা কি এই দিনের মাধ্যমে সমকামিতার স্বাধীনতা, ঈমানহীনতার প্রচার চেয়েছিল? তোর লেখা সে শহীদদের ত্যাগের অবমাননা।

  24. তুমি যে জায়গাটা ধরেছ একুশের মঞ্চে ফ্যাসিবাদ বিরোধী কথা বলা হয়, কিন্তু একই রাষ্ট্র ও রাজনীতি ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন মত, সংখ্যালঘু কণ্ঠকে এখনও দমন করে এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতির রাজনীতি আর বাস্তব রাজনীতির ব্যবধানটাই একুশকে ফাঁকা করে দিচ্ছে।

  25. তোর লেখায় আল্লাহর কোনো জায়গা নেই; জাতীয়তা, ভাষা, বাম রাজনীতি এসবই তোর কাছে সবকিছু। একুশের কথা বলতে গিয়ে কোরআন, ইসলাম, মুসলিম পরিচয়ের অবদানকে একবারও শ্রদ্ধা না দেখিয়ে তুই আসলে নিজের নাস্তিক এজেন্ডার প্রচারই করছিস; আল্লাহর কাছে এর জবাব কষ্টের হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *