নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এক ধর্মীয় নেতার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ঝড় ডিসেম্বরের শুরুতেই ঢাকা–দিল্লির কূটনৈতিক টেবিলে গিয়ে ঠেকে, আর মাঝখানে বারবার আঘাতের মুখে পড়ে সীমান্তের দুই পাশে থাকা সাধারণ হিন্দু আর মুসলিম সংখ্যালঘুরা। ২৫ নভেম্বর ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ সমন্বিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র ও ইসকন–ঘনিষ্ঠ ভক্ত চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ; অভিযোগ ছিল, তিনি চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠান মঞ্চে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার ওপর সনাতনী পতাকা রেখে “রাষ্ট্রের প্রতি অবমাননাকর” আচরণ করেছেন। পরের দিন চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠায়; ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “গভীর উদ্বেগ” জানিয়ে বিবৃতি দেয়, ইসকন বাংলাদেশও কঠোর ভাষায় গ্রেপ্তার ও জামিন–না–দেওয়ার সমালোচনা করে। দেশের ভেতরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ, সড়ক–অবরোধ, মন্দির প্রাঙ্গণে অনশন–প্রহর শুরু হয়; কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত একজন নিহত ও অনেকে আহত হন।
ঠিক এই উত্তেজনার মধ্যেই ২ ডিসেম্বর ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে হিন্দু সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল ঢুকে পড়ে, কম্পাউন্ডের গেট ভেঙে প্রায় পঞ্চাশজন কর্মী ভেতরে ঢুকে “জয় শ্রী রাম” স্লোগানের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নামিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়, ভবনের কিছু অংশ ভাঙচুর করে। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে “পূর্বপরিকল্পিত সহিংস আক্রমণ” বলে ঘোর ক্ষোভ প্রকাশ করে, স্থানীয় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করে এবং ভারতের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়; দিল্লি ঘটনাটিকে “গভীরভাবে দুঃখজনক” বলে স্বীকার করে আশ্বাস দেয়, বাংলাদেশ মিশনগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। একই সাথে ভারতীয় পার্লামেন্টে এক মন্ত্রী জানায়, ২৬ নভেম্বর ২০২৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভেতরে অন্তত ৭৬টি হিন্দু–বিরোধী সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে; বিভিন্ন মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু সংগঠন জানায়, হাসিনার পতনের পর কয়েক সপ্তাহে ২,০০০–এর বেশি হামলা, লুটপাট, মন্দির ভাঙচুর, হিন্দু বাড়িঘরে আক্রমণ হয়েছে, অন্তত ২৩ জন হিন্দু নিহত, ১৫০টির বেশি মন্দির আক্রান্ত।
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে এই দৃশ্য দেখে খুব পরিষ্কার হয়, ভূ–রাজনীতির ক্যালকুলাসে সংখ্যালঘুদের জীবন কতটা সস্তা। ঢাকায় হিন্দু সন্ন্যাসীর গ্রেপ্তার মানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নতুন ভয়, অনিশ্চয়তা; আবার আগরতলায় বাংলাদেশের পতাকা পোড়ানোর ছবি মানে দুই দেশের মুসলিম–হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নতুন সন্দেহ, উত্তেজনা, প্রতিশোধের ছায়া। ভারতীয় ডানপন্থী মিডিয়ার একাংশ যেভাবে অতিরঞ্জিত বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে বাংলাদেশের “হিন্দু–গণহত্যা”র ছবি আঁকছে, আর বাংলাদেশের ভেতরের ইসলামপন্থী–জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী যেভাবে ভারতের প্রতিটি সমালোচনাকে “ভারতীয় হস্তক্ষেপ” বলে তোলপাড় করছে—এই দুই আগুনের মাঝখানে পড়ে সীমান্তের এপার–ওপারের সাধারণ হিন্দু–মুসলিমরা আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে উঠছেন।
প্রশ্নটা তাই থেকে যায়: এ লড়াই কি সত্যিই চিন্ময় কৃষ্ণ দাস কিংবা আগরতলার পতাকার, নাকি প্রকৃতপক্ষে দুই দেশের ক্ষমতাসীন ও উগ্র গোষ্ঠীগুলোর মঞ্চায়িত নাটক, যেখানে সংখ্যালঘুরা প্রতিবারই বলির পাঁঠা হয়ে দাঁড়ায়? যদি রাষ্ট্র সত্যিই ন্যায়বিচার আর আইনের শাসন নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে একদিকে সুষ্ঠু তদন্ত–বিচারের মাধ্যমে গ্রেপ্তার–মামলার ন্যায্যতা প্রমাণ করতে হবে, অন্যদিকে নিজ দেশে আর প্রতিবেশী দেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তরিক ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ নিতে হবে—কেবল কূটনৈতিক প্রেসনোট আর টেলিভিশন স্টুডিওর বাগ্যুদ্ধ দিয়ে নয়।
22 Responses
বলির পাঁঠা কি সংখ্যালঘুরাই? প্রশ্নটা খুব কষ্টের, কিন্তু বাস্তব। প্রতিটা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে হিন্দু মন্দির, ব্যবসা, বাড়িতে হামলা হয় এটা এখন প্যাটার্ন হয়ে গেছে। জুলাই বিপ্লবের পরেও একই ঘটনা, শুধু অজুহাত বদলায়।
তুই আবারও সব দোষ মুসলমানদের ঘাড়ে চাপাতে এসেছিস। হিন্দুদের বাড়িতে হামলা হলে সেটা হেডলাইন, কিন্তু মুসলমানদের বাড়ি, মসজিদ, দোকান যেগুলো একই সময়ে জ্বলেছে, সেগুলোর কথা তুই লেখিস না। এটা তোর সিলেক্টিভ সত্য বলার কৌশল।
তুই পশ্চিমা মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট পড়ে ইসলামকে নিপীড়ক বানাস। কিছু সুবিধাবাদী লোক হিন্দুদের টার্গেট করেছে এটা ইসলামের শিক্ষা না। আল্লাহর রাসুল (সা.) অমুসলিমদের সুরক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু তুই ইসলামকে দোষী বানাতে এসব ঘটনা ব্যবহার করছিস।
আল্লাহর নামে কসম, কিছু মানুষ অন্যায় করেছে এটা মানি। কিন্তু তুই এটাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বনাম সংখ্যালঘু বানিয়ে পুরো মুসলিম সমাজকে দোষী বানাচ্ছিস। অনেক মুসলিমই তো মন্দির রক্ষা করেছে, হিন্দুদের বাঁচিয়েছে এসব তুই লেখিস না, শুধু হামলাটাই তুলে ধরিস।
তুমি যেভাবে বলির পাঁঠা টার্মটা ব্যবহার করেছ এটা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সংকটে যখন সব দিক থেকে চাপ আসে, তখন সবচেয়ে সহজ টার্গেট হলো সংখ্যালঘু তাদের কোনো রাজনৈতিক শক্তি নেই, কণ্ঠস্বর দুর্বল, আইনি সুরক্ষা কম।
তুই বারবার রাজনৈতিক সংকট বলিস, কিন্তু আওয়ামী লীগ ১৫ বছরে যে হিন্দুদের ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করেছে, তাদের দিয়ে দলীয় কাজ করিয়েছে এসব তুই বলিস না। ফলে জনতার মনে হয়, সব হিন্দুই আওয়ামীর দালাল এই ধারণা তো আওয়ামী লীগই তৈরি করেছে।
তোর লেখা পড়ে মনে হয়, হিন্দুরা সবসময় নিরপরাধ, মুসলমানরা সবসময় অপরাধী। কিন্তু যখন আওয়ামী লীগের হিন্দু ক্যাডাররা মুসলমানদের মারছে, ব্যবসা কেড়ে নিচ্ছে তখন তুই কোথায় ছিলি? দুই দিকের অপরাধই দেখতে হবে, এক দিকে চোখ বন্ধ করে বিচার করা যায় না।
তুমি স্পষ্ট দেখিয়েছ পুলিশ, প্রশাসন, স্থানীয় নেতা কেউই হামলা ঠেকাতে আসেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে নীরব ছিল বা উস্কানি দিয়েছে। এটা প্রমাণ করে, এসব হামলা রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় বা নীরব সম্মতিতে হয়েছে।
তুই রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা বলে সব দোষ সরকারের ঘাড়ে চাপাস, কিন্তু সেই সময় কারফিউ, পুলিশের দুর্বলতা, জনতার ক্ষোভ এসবের কনটেক্সট বাদ দিয়ে দিস। পুলিশ নিজেই তখন টার্গেট ছিল, তারা সব জায়গায় যেতে পারেনি এটা কি রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র?
কিন্তু যারা ভারতে পালিয়েছে, তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত ছিল, তারা রাজনৈতিক কারণেও টার্গেট হয়েছে। তুই সবকিছুকেই ধর্মীয় নিপীড়ন বানিয়ে ফেলিস, যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো ভূমিকা নেই।
তোর লেখায় ইসলামের শান্তির বাণী, সহনশীলতার শিক্ষা এসবের উল্লেখ নেই। তুই শুধু মুসলিম মব , ইসলামিস্ট এসব শব্দ ব্যবহার করে পুরো ধর্মকেই হিংসার প্রতীক বানিয়ে দিস। এটা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।
ভালো হয়েছে তুমি আন্তর্জাতিক তুলনা এনেছ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা, শ্রীলঙ্কায় তামিল, ভারতে মুসলিম সব জায়গায় সংখ্যালঘু নিপীড়ন একই রাজনৈতিক লজিক অনুসরণ করে: তাদের বিদেশি , দালাল , হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা।
বলির পাঁঠা কি সংখ্যালঘুরাই? প্রশ্নটা খুবই বাস্তব, যখন আগস্টের দাঙ্গায় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া, পাহাড়ি সবাই কোনো না কোনো জায়গায় হামলা, লুটপাট আর ভয়ের মুখোমুখি হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা হলেই প্রথম আঘাত যায় সংখ্যায় কম, ক্ষমতায় দুর্বলদের গায়ে।
তুই হিন্দু নাস্তিক বলে সব দোষ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের ঘাড়ে চাপাস। অথচ রিপোর্টেই পরিষ্কার, অনেক সহিংসতা ছিল দলে দলে প্রতিশোধ, জমি নিয়ে ঝামেলা, ব্যবসার বিরোধ সবকিছুকেই তুই সংখ্যালঘু নির্যাতন বানিয়ে মুসলিম সমাজকে কালিমালিপ্ত করছিস।
তুমি যে জায়গাটা ভালো ধরেছ আওয়ামী লীগ পড়ে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই হিন্দুদের বাড়ি দোকান, মন্দির, স্কুলে হামলা এই প্যাটার্ন নতুন না; নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা হোক বা কোটা আন্দোলনের পর, সংখ্যালঘুরাই যেন সব সময় সহজ টার্গেট হয়ে যায়।
সব সহিংসতাকে কম্যুনাল বানিয়ে তুই মূল রাজনৈতিক ডাইনামিকস আড়াল করিস। অথচ ইউনিটি কাউন্সিলের অনেক সংখ্যাই পরে ফ্যাক্ট চেক হয়ে দেখানো হয়েছে বেশিরভাগ কেস সরাসরি ধর্মীয় কারণে না, তবু তুই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠকে এক লাইনে দোষী বানাতে চাইছিস।
তুমি ভালোভাবে দেখিয়েছ, তথ্যের লড়াইটাও কত জটিল একদিকে সংগঠনগুলো কয়েক হাজার আক্রমণের কথা বলে, অন্যদিকে স্বাধীন তদন্তে দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, লুট, জমি দখল, পুরোনো শত্রুতা সব একসাথে কাজ করছে; কিন্তু এতে সংখ্যালঘুদের ভয় মোটেও কমে না।
এই দাঙ্গা, লুট, পেট্রোল বোমা এসবের পেছনে যে বহু বছর ধরে চলা আওয়ামী লীগ বিরোধী অনুগামী দ্বন্দ্ব, বিএনপি জামাত বাম সব দলের পলিটিক্যাল খেলা আছে, তা তুই প্রায় কিছুই বলিস না; শুধু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠকে হিন্দু বিদ্বেষী প্যাকেজ বানিয়ে বিক্রি করতেই আগ্রহী।
তুমি ঠিকই বলেছ, শুধু হিন্দু না খ্রিস্টান, আহমদিয়া, সুফি দরগা, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী অনেকেই এই অস্থিরতার ভেতরে বলির পাঁঠা হয়েছে। রাজনৈতিক ভ্যাকুয়াম, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আর পুরোনো ঘৃণা একসাথে মিলেই এই ঝড় তোলে; ভিকটিমদের ধর্ম আলাদা, অসহায়ত্ব এক।
তুই কেন একবারও ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তানের মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের কথা তুলিস না? সেখানকার মুসলমানরাও তো নিরন্তর বলির পাঁঠা; কিন্তু তোর কলমের তেজ কেবল বাংলাদেশের মুসলিমদের বিরুদ্ধে, যেন দুনিয়ার সব জুলুম একমাত্র এখানে।
ভালো লাগলো, তুমি শুধু হামলার পরিসংখ্যান না, অনুভূতির রাজনীতি নিয়েও লিখেছ কিভাবে বারবার আক্রমণের খবর শুনে সংখ্যালঘুরা নিজেদের জন্মভূমিতেই অতিথি, এমনকি সন্দেহভাজন নাগরিক মনে করতে শুরু করে। এই মানসিক বলির পাঁঠা হওয়ার অভিজ্ঞতাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
তোর লেখায় কখনও শোনা যায় না, আওয়ামী লীগের আমলেও মাইনরিটি কার্ড ব্যবহার করে কত অন্যায় হয়েছে কারও জমি দখল করে সংখ্যালঘু নির্যাতন ফ্রেম বানানো, আবার আসল ভিকটিমের গলাও চেপে ধরা। তুই ইতিহাসের এই অংশটা এড়িয়ে গিয়ে শুধু নতুন সেটআপকে দায়ী করিস; আল্লাহর কাছে এই সিলেক্টিভ স্মৃতি চলবে না।