রাহুল আনন্দের পোড়া ঘর: এই স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম?

৫ আগস্টের উন্মাদ আনন্দের ঢেউ থামার আগেই ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এক গলিতে আগুনের লেলিহান শিখা আমাদেরকে অন্য এক বাস্তবতায় টেনে নিয়ে গেল। জলর গানের ফ্রন্টম্যান, জনপ্রিয় লোকসংগীতশিল্পী রাহুল আনন্দের বাড়ি ভাঙচুর করে, লুটপাট করে, শেষে আগুন ধরিয়ে দিল একদল উন্মত্ত লোক। এই বাড়িটা শুধু একটা বাসা ছিল না; এটা ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক আশ্রম, প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো কাঠের–ইটের এই বাড়িতে তিনি ৩ হাজারের বেশি নিজ হাতে বানানো বাদ্যযন্ত্র, সংগ্রহ করা লোকজ সামগ্রী, গানের আর্কাইভ, কনসার্টের পোস্টার, বই, নথি জমিয়ে রেখেছিলেন। হামলাকারীরা প্রথমে গেট ভেঙে ঢোকে, যা যা পায় লুট করে নিয়ে যায় — ফার্নিচার, আয়না, ইলেকট্রনিক্স, বই, বাদ্যযন্ত্র — তারপর সবকিছুতে আগুন লাগিয়ে পুরো বাড়িটাকেই খোলামেলা খোয়া–খোলা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। সৌভাগ্য যে রাহুল, তার স্ত্রী শুক্লা, ছেলে তোতা আর বাড়ির অন্যরা কোনোভাবে পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে গিয়ে বেঁচে যান, কিন্তু তাদের জীবনভর গড়া সাংস্কৃতিক ঘরটি ছাইয়ে পরিণত হয়।
 
একই সময়ে সারা দেশে এমন আরো শত শত দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের বাড়ি, দোকান, মন্দির, মঠ, স্কুল, এমনকি মৃত্তিকা–গড়া প্রতিমা, ভাস্কর্য, ভাসমান সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে; দেশের বিভিন্ন জেলায় সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠন, হিন্দু–বৌদ্ধ–খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানাচ্ছে, কয়েক দিনের মধ্যে কমপক্ষে ২০০–৩০০ বাড়ি, ডজনখানেক মন্দির, অসংখ্য দোকান–ব্যবসা–প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে, প্রায় ৪০ জন আহত হয়েছে। Human Rights Watch বলছে, শেখ হাসিনার পতনের আনন্দ উদযাপনের মধ্যেই অসংখ্য জায়গায় প্রতিশোধমূলক হামলা হয়েছে, বিশেষ করে যাদেরকে আওয়ামী লীগপন্থী বা “সংখ্যালঘু–সমর্থক” হিসেবে দেখা হয়, তাদের ওপর; একই সাথে Liberation War ও বাংলা সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবেও অনেক ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙা হয়েছে। কেউ ভাঙছে “মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক” বলে, কেউ “মূর্তি হারাম” বলে, কেউ বা সুযোগ নিয়ে কেবল পাশের হিন্দুর জমি–দোকান দখল করছে।
 
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে রাহুল আনন্দের পোড়া ঘর আমার কাছে শুধু এক শিল্পীর ব্যক্তিগত ক্ষতি না, বরং এই বিপ্লবের ভেতর লুকিয়ে থাকা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের মুখ। রাহুল সেই শিল্পীদের একজন, যিনি বছরের পর বছর গ্রাম–বাংলার গান, নদী, মাটি, মানুষের গল্প দিয়ে শাসক–বিরোধী অথচ মানবিক এক ভাষা তৈরি করেছেন; তিনি নিজেই কোটাবিরোধী আন্দোলনের, স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের পক্ষে সরব ছিলেন। তবু তার বাড়ি পুড়ল, তার যন্ত্র, আর্কাইভ ধ্বংস হল — এটাই দেখায়, যখন ভিড় উন্মত্ত হয়ে ওঠে, তখন সে “কার পক্ষে ছিলে” আর “কোন পার্টির” ছিলে, এই পার্থক্য করে না; সে শুধু জানে, যার বাড়িতে আগুন লাগালে নিজে কিছু লুট করতে পারবে, কিছু ঘৃণা ঝেড়ে ফেলা যাবে, তারই গায়ে পেট্রোল ঢেলে দিতে হবে।
 
আরও ভয়ের বিষয় হল, এই সব হামলাকে ঘিরে দুই ধরনের বর্ণনা তৈরি হয়েছে। একদিকে, ভারতের কিছু মিডিয়া আর ডানপন্থী গোষ্ঠী এগুলোকে “হিন্দু–বধ”, “গণহত্যা”, “পোগ্রম” বলে দেগে দিয়ে নিজেদের ঘৃণা–রাজনীতিকে পুঁজি করেছে, কখনও ভুল তথ্য, কখনও অতিরঞ্জন দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ভরিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরের কিছু “নতুন প্রগতিশীল” মুখ বলেছে, “রাহুলদার বাড়ি পুড়ানো তার ধর্মের কারণে নয়, এটা কেবল দুর্বৃত্তদের কাজ, এটাকে সাম্প্রদায়িক রঙ দিও না”, যেন সম্পূর্ণভাবেই অস্বীকার করা যায় যে সংখ্যালঘু হওয়া, সাংস্কৃতিক প্রতীক হওয়া, আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হওয়া — এসব পরিচয় একসাথে এই হামলায় ভূমিকা রেখেছে। বাস্তবতা হল, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সাম্প্রদায়িক ঘৃণা আর সরল চোরাবৃত্তি মিশে গেছে; কিন্তু ভিকটিমের দৃষ্টিতে এই পার্থক্য খুব একটা সান্ত্বনা আনে না।
 
এই স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম? যে স্বাধীনতার ডাকে লাখো তরুণ–তরুণী রাস্তায় নেমেছিল, তারা কি কল্পনা করেছিল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদেরই প্রতিবেশী হিন্দুর বাড়ি জ্বলে উঠবে, তাদের প্রিয় শিল্পীর গানের ঘর ছাই হয়ে যাবে, তাদের গ্রাম–মন্দিরের ঘণ্টার বদলে ধোঁয়ার গন্ধ ভাসবে? রাহুল আনন্দ পরে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, তার বাড়ি, যন্ত্র, আর্কাইভ হারিয়ে গেলেও তিনি বিশ্বাস হারাচ্ছেন না, তিনি এখনও গান গেয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান; একই সাথে তিনি বলেছেন, “আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশের সাথে এই সহিংসতার কোনো মিল নেই।” এই কণ্ঠগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার, কারণ বিপ্লব যদি সংখ্যালঘু, নারী, কুইয়ার, সংস্কৃতিবান মানুষদের বুকে ভয় ঠেকিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, তাহলে সেটা কেবল নতুন পোশাকে পুরোনো স্বৈরাচার।
 
অন্তর্বর্তী সরকার, সেনাবাহিনী, ছাত্রনেতারা এখন বারবার বলছে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেবে, হামলাকারীদের বিচার করবে। Human Rights Watch, UN, বিভিন্ন সংস্থা স্পষ্টভাবে বলেছে, হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর এই প্রতিশোধমূলক হামলা “ঘৃণ্য” এবং নতুন সরকারের বৈধতা বজায় রাখতে হলে এদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কিন্তু আমরা যারা দীর্ঘ ইতিহাস জানি, তারা জানি, প্রতিবারই কিছু মামলা হবে, কয়েকটা গ্রেপ্তার হবে, তারপর ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে, যতক্ষণ না পরের সহিংসতা শুরু হয়। তাই এইবার যদি সত্যিই বদল আনতে চাই, তাহলে শুধু রাহুল আনন্দের বাড়ির ছাই–ভস্ম দেখে কাঁদলেই হবে না; আমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে, যে বিপ্লব সংখ্যালঘু ও সংস্কৃতির নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেটাকে আমরা সম্পূর্ণ বিজয় বলে মানতে পারি না।
 
রাহুলের পোড়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তাই আমার মনে হয়, এই স্বাধীনতা এখনও অসম্পূর্ণ। আমরা এক স্বৈরাচারকে নামিয়েছি, কিন্তু নিজেদের ভেতরের ছোট ছোট অত্যাচারী, সাম্প্রদায়িক, সুযোগসন্ধানী সত্তাকে নামাতে পারিনি। সেই কাজ না হওয়া পর্যন্ত, প্রতিটি বিপ্লবের পরে আরেকটি পোড়া ঘরের গল্প আমাদের লিখতেই হবে; আর প্রতিবারই প্রশ্নটা ফিরে আসবে — এই স্বাধীনতা কি সত্যিই সেই স্বাধীনতা, যার স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম?

31 Responses

  1. রাহুল আনন্দের পোড়া ঘর: এই স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম? প্রশ্নটা শুধু একজন সংগীতশিল্পীর জন্য না, পুরো দেশটার জন্য প্রযোজ্য। একদিকে বিপ্লবের ভাষণ, অন্যদিকে জোলার গানের ঘর পুড়িয়ে দেওয়া এটা তো মুক্তি না, নতুন দমন।

  2. তুই হিন্দু নাস্তিক বলে স্বাভাবিকভাবেই সব দোষ মুসলিমদের ঘাড়ে চাপাস। অথচ অনেক রিপোর্টেই বলা হচ্ছে, রাহুলদের বাড়িতে হামলা করা মবের ভেতরে স্থানীয় দুষ্কৃতিকারী, সুযোগসন্ধানী লুটেরাও ছিল; সবকিছুকে ইসলামিস্ট বানিয়ে তুই নিজের এজেন্ডা চালাচ্ছিস।

  3. তুমি যে জায়গাটা খুব স্পষ্ট করেছ রাহুল আনন্দ শুধু হিন্দু না, তিনি এই বিপ্লবের পক্ষে গান গেয়েছেন, তবুও তার ঘর পুড়েছে এটা দেখায়, মবের কাছে কেউ নিরাপদ না। যে আগুন আজ শত্রু র ঘরে লাগছে, কাল সেই আগুন নিজেদেরও গ্রাস করতে পারে।

  4. তুই বারবার এটাকে ইসলামিস্ট হিংসা বানাচ্ছিস, কিন্তু পোড়ানো হয়েছে আওয়ামী লীগ অফিস, তরুণ ছাত্র, এমনকি অনেক মুসলিম সাংস্কৃতিক কর্মীর বাসাও। সবকিছুকে এক লাইনে সংখ্যালঘু নির্যাতন বললে পুরো ট্রাজেডিটাই রাজনৈতিক দিক থেকে খালি হয়ে যায়।

  5. তুমি সুন্দরভাবে তুলেছ রাহুলের ৩ হাজারের বেশি বাদ্যযন্ত্র, ১৪০ বছরের পুরোনো বাড়ি, ম্যাক্রোঁ থেকে শুরু করে অজস্র শিল্পীর আসা যাওয়া সবকিছুকে ক্রাইসিসে গোপন আক্রমণ দিয়ে মুছে দেওয়া হয়েছে। এটা কেবল একটি বাড়ি নয়, বাঙালির বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর বার্তা।

  6. তুই সব সময় মুসলমানদের দায়ী করিস, কিন্তু পুলিশের নৈরাজ্য, আওয়ামী লীগের বছরের পর বছর গড়া ঘৃণা রাজনীতি, বিদেশি প্রপাগান্ডা এসব নিয়ে তোর কলম নীরব। রাহুলের বাড়ি পোড়ানো দুঃখজনক, কিন্তু তুই এই ট্র্যাজেডিকে ব্যবহার করে মুসলিম সমাজকে দোষী প্রমাণ করতে চাইছিস।

  7. তুমি ঠিকই বলেছ, রাহুলের পোড়া ঘর শুধু হিন্দু সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে না, একজন সাংস্কৃতিক প্রতীক হওয়ার কারণেও টার্গেট। যেই ঘরে গান, মিশ্র দল, মুক্ত আলোচনা হতো, সেই ঘরকে পুড়িয়ে মব আসলে কী বার্তাই বা দিতে চেয়েছে তুমি সেই প্রশ্নটা মিস করোনি।

  8. তোর কাছে সব সাংস্কৃতিক মানুষই নাকি মুক্তিযোদ্ধা ধরনের হিরো, আর এসবের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই ওয়াহাবি , ইসলামিস্ট । রাহুল যে আগেই আওয়ামী সরকারের অনেক প্রপাগান্ডা ইভেন্টে পারফর্ম করেছে, এসব ব্যাপারে তোর কোনো সমালোচনা নাই সিলেক্টিভ ন্যায়বোধ।

  9. ভালো লেগেছে যে তুমি শুধু ঘর পোড়ানোর কথা না, পরের ঘটনাগুলোর কথাও বলেছ কীভাবে অনেক মুসলিম প্রতিবেশী রাহুলদের বাঁচাতে গিয়েছে, পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছে। এতে বোঝা যায়, মব আর কমিউনিটি দুইটি এক জিনিস না; আশা হীনতার ভেতরেও একটু আশার আলো আছে।

  10. তোর লেখা পড়ে মনে হয়, বাংলাদেশের মুসলমান মানেই হিন্দুবিদ্বেষী। অথচ একই রিপোর্টে আছে, অনেক মুসলিমই নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে মন্দির বাড়ি রক্ষা করেছে। তুই ইচ্ছে করেই সেই অংশটা খুব কম জোরে বলিস, যেন ঘৃণার ন্যারেটিভটাই বেশি জোরালো থাকে।

  11. মো. সোলায়মান হোসেন says:

    এই স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম লাইনটা আসলে খুব সৎ। যারা রাস্তায় নেমে গান গেয়ে বিপ্লব চাইছিল, তাদেরই একজনের ঘর জ্বলে গেল; এতে স্পষ্ট, আমাদের মব সংস্কৃতি কারও বন্ধু না, কেবলই অরাজকতার হাতিয়ার।

  12. তুমি যে ভাবে রাহুলের ঘরের সাথে অন্য সংখ্যালঘু বাড়িতে হামলার খবরগুলো জুড়েছ, তাতে বোঝা যায় ভুল করে এক বাড়ি না, পরিকল্পিতভাবে ভয় দেখানো হচ্ছে। মানুষ দেশ ছাড়ুক, চুপ থাকুক, মাথা নিচু করে চলুক এইটাই মেসেজ।

  13. তুই সবকিছুতেই সংখ্যালঘু শব্দটা এমনভাবে ব্যবহার করিস, যেন মুসলিমদের বাড়িতে কোনোদিন হামলা হয় না। অথচ একই অশান্তিতে অনেক মুসলিমের দোকান বাড়িও পোড়ানো হয়েছে তাদের কষ্ট তোর চোখে পানি আনে না কেন?

  14. রাহুলের বাড়ি নিয়ে তুমি যে ইন্টারন্যাশনাল কাভারেজের রেফারেন্স এনেছ বিরাট মিউজিক হাব, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা, ইন্টারন্যাশনাল আর্টিস্টদের যাতায়াত এগুলো দেখেই বোঝা যায়, মবের চোখে এই বাড়িটা অন্যরকম কোনো জায়গা ছিল, তাই টার্গেট।

  15. তোর লেখা পড়ে মনে হয়, রাহুলরা শুধু ভিকটিম, কোনো পলিটিক্যাল পজিশন তাদের নাই। কিন্তু গান, শো, লাইভ সবই একটা সাইড বেছে চলে। এই সত্যিটা না বলে একেবারে সাদা কালো ছবি আঁকলে, বিশ্লেষণ কম, আবেগ বেশি হয়ে যায়।

  16. তুমি যে লাইনটা ব্যবহার করেছ যে ঘর থেকে বিপ্লবের জন্য গান বেরিয়েছিল, আজ সেই ঘরই জ্বলছে এটা খুব কঠিন। আমাদের revolutions সবসময়ই শিল্পীদের ব্যবহার করে, কিন্তু বিপদের সময় প্রথমেই তাদের ফেলে দেয়; রাহুলের কেস সেই পুরোনো ইতিহাসের নতুন অধ্যায়।

  17. তুই রাহুলের পোড়া ঘরের কথা লিখিস, ভালো। কিন্তু একই সময়ে গ্রামের মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তা ঘাটেও হামলা হয়েছে ওগুলোর ছবি, ভিডিওও তো আছে। সেখানকার মুসলমানদের ভয়, ক্ষতি, আতঙ্ক এসব কি তোর লেখা এই স্বাধীনতা র হিসাবের অংশ না?

  18. ভালো লাগল যে তুমি আগের সরকারের দমন আর নতুন মবের দমন দুটোকেই আলাদা করে দেখিয়েছ। কেউ কেউ ভাবে, শুধু শেখ হাসিনাকে সরালেই সব ঠিক হয়ে যাবে; রাহুলের ঘর প্রমাণ করেছে, কাঠামো না বদলালে শুধু পতাকা বদলায়, দমন না।

  19. একটু খারাপ লেগেছে, তুমি পুরো লেখায় রাহুলের নিজের কণ্ঠ ইন্টারভিউ, পোস্ট, স্টেটমেন্ট খুব কম এনেছ। তিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, সেটা থাকলে পাঠকের সামনে আরও জটিল একটা ছবি আসত।

  20. তবু লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি, তুমি মব আর বিপ্লবী জনতা এই দুইটার পার্থক্য স্পষ্ট করেছ। যে ভিড় ক্ষমতার ভাষা শেখে না, শুধু গালি আর আগুন জানে, তারা সব সময়ই কোনো না কোনো রাহুলের ঘর খুঁজে পাবে।

  21. নাস্তিক আপা, তুই সব সময় মুসলিমদের গায়েই দোষগুলো লিখিস। আল্লাহর নামে কেউ অন্যায় করলে সে মুসলিমেরও ক্ষতি করছে এই জায়গাটা একটু জোর দিয়ে বলতে পারতি। তাহলে অন্তত বোঝা যেত, তুই সব মুসলিমকে এক লাইনে অপরাধী ভাবিস না।

  22. তুমি লিখেছ, সংস্কৃতির ঘর পুড়লে শুধু ইট কাঠ না, ভাষা, গান, স্মৃতি সব পুড়ে যায়। এই কথাটা খুব সত্যি। একটা দেশের ওপর আক্রমণ মানেই শুধু রাষ্ট্রদফতর নয়; শিল্পীদের জায়গা উজাড় করে দেওয়াও এক ধরনের জাতিগত আত্মহত্যা।

  23. তোর লেখায় সব সময় মুসলিম বনাম হিন্দু ফ্রেম থাকে; কিন্তু ভাষা, শ্রেণি, রাজনীতি এসবের লেয়ারও আছে। যারা লুট করতে গেছে, তারা জানত এই ঘরে দামি যন্ত্র, ইন্সট্রুমেন্ট আছে দরিদ্রতা আর অপরাধী মানসিকতাও কাজ করেছে, এটাও দেখতে হবে।

  24. রাহুলের গল্প থেকে তুই যে broader প্রশ্ন তুলেছিস এই স্বাধীনতা মানে কি শুধু নতুন মবের স্বাধীনতা? এটা জরুরি। নতুন সরকারের লোক, বিপ্লবী সংগঠন, স্থানীয় নেতা কেউই যদি মবের সামনে দাঁড়াতে না চায়, তাহলে এই স্বাধীনতা সত্যি খালি শ্লোগান।

  25. তোর লেখায় মাঝে মাঝে মনে হয়, তুই এক ধরনের গিল্ট ট্যুরিজম বিক্রি করিস বিদেশি পাঠকদের সামনে বাংলাদেশকে কেবল জ্বলন্ত মন্দির, পোড়া ঘর, কাঁদতে থাকা হিন্দুদের দেশে বানিয়ে ফেলিস। যদিও বাস্তব সমস্যা আছে, কিন্তু একমাত্র ছবিটা এটাই না।

  26. তুমি ভালোভাবে দেখিয়েছ এই হামলা শুধু এক রাতের না; আগে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় উসকানি, ভারতের দালাল , আওয়ামী সাংস্কৃতিক এজেন্ট ইত্যাদি ভাষায় টার্গেট করা হচ্ছিল। অনলাইনের ঘৃণাই শেষে অফলাইনে আগুন হয়ে নেমেছে।

  27. আবারও দেখলাম, তোর ধর্মবিরোধী টোন আগের মতোই আছে। কেউ যদি হিন্দু বলে টার্গেট হয়, সেটা অবশ্যই অন্যায়, কিন্তু তার মানে এই না যে মুসলিম ধর্মীয় পলিটিক্স সবসময় কেবল দানবের ভূমিকাতেই থাকে এমন ওভারজেনারালাইজেশন নিজেই বর্ণবাদী হয়ে যায়।

  28. রাহুলের পোড়া ঘর অংশটা পড়ে নিজের ছোটবেলার সংগীতশিক্ষকের বাড়ির কথা মনে পড়ল, যে একবার হামলার পর দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সাংস্কৃতিক মানুষদের ভয় পেলে একটা সমাজের ভবিষ্যতই আসলে ভয় পায়।

  29. তুই সব সময় রাষ্ট্রকে ফ্যাসিস্ট , মবকে ধর্মান্ধ আর সংখ্যালঘুদের নিরীহ বানাস। বাস্তবতা অনেক বেশি কমপ্লেক্স কিছু সংখ্যালঘু নেতা আগের সরকারের সাথেও অন্যায় সুবিধা নিয়েছে, এই অভিযোগগুলোও আছে। তুই সেগুলো একেবারে বাদ দিলি।

  30. তবু মানতেই হবে, রাহুলের পোড়া ঘর না থাকলে হয়ত অনেকেই বুঝত না, এই বিপ্লবের অন্ধকার দিকটা কতটা সিরিয়াস। রাষ্ট্র, দল, জনগণ তিনজনই যদি এই ধরণের আক্রমণকে অভিযোগ তদন্তাধীন বলে পাশ কাটায়, তাহলে স্বাধীনতা সত্যিই একটা ফাঁকা শব্দ।

  31. লেখাটা পড়ে মনে হলো, তুমি শুধু শোক না, রাগও ভাষায় ধরতে পেরেছ। এই স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম এই প্রশ্নটা রাহুলের জন্য যেমন, তেমনি তাদের জন্যও, যারা আজও এই দেশটা ছেড়ে যাওয়ার টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *