বাংলাদেশে বড়দিনের উৎসব কি শুধু গির্জার ঝলমলে রঙ আর কেক–পাইয়ের উল্লাস? নাকি, ডিসেম্বরের বাতাসে ঢাকঢোলের সাথে মিশে থাকে নিঃশব্দ আতঙ্ক, জানালার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা চোখ, ক্যাথেড্রালের গেটের বাইরে পুলিশ পাহারা, গ্রামের ছোট চার্চে সর্তকতা? ২০২৩ সালের ডিসেম্বর ছিল আরও বেশি অস্থিরতা জড়ানো, কারণ জানুয়ারির নির্বাচন ঘনিয়ে এসেছিল, রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রতার ঝুঁকি নতুন মাত্রায় পৌঁছেছিল। বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো আগে থেকেই সতর্ক করেছিল, সংখ্যালঘু, বিশেষ করে খ্রিস্টান, হিন্দু, উপজাতি, সবাই আতঙ্কিত। বরাবরের মতো গুজব, হুমকি, কখনও ভয়াবহ আক্রমণের ইতিহাস এ বছরের প্রস্তুতিকে ঘিরে রেখেছিল।
অনেক খ্রিস্টান পরিবার শহর ছেড়ে গ্রামে যায়নি, বা গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যায়নি, ডর নিয়েই বড়দিনের ঈশ্বর–সেবায় যোগ দিয়েছে, অনেক এলাকায় রাতের “মিডনাইট ম্যাস” বাতিল হয়েছে, ছোট করে খ্রিস্টমাস পালন হয়েছে। কারণ তারা জানে, নির্বাচন এলেই অতীত অভিজ্ঞতায় বারবার বাইরে থেকে হামলা, উসকানি, গুজব, হামলাকারীর হামলা, এসব যে কোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে। উত্তরবঙ্গের গ্রামে–উপজাতি–অঞ্চলে নিশ্চিতভাবে অনেক খ্রিস্টান বাড়ি, দোকান, চার্চ হামলার বা হুমকির মুখে পড়েছে, যেখানে হামলাকারীদের কৌশল খুব পরিচিত: জমি দখল, জোরে গুজব ছড়ানো, “মুসলিম ধর্মান্তরিতদের সংখ্যা বাড়ছে” বলে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি, স্থানীয় মাদ্রাসা বা জুমার নামাজ থেকে হঠাৎ মাইক লাগিয়ে ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলা।
আর্চবিশপ থেকে শুরু করে ঈশ্বর–সেবক, সরল বিশ্বাসী খ্রিস্টান পরিবার, সবাই বলেছে, নির্বাচনের আগে ও পরে অতীতে কতো আক্রমণ, প্রহার, ভাঙচুর, ভাড়া বাড়ি থেকে উচ্ছেদের নোটিশ, এসবের সংখ্যা বাড়ে। অনুসন্ধানী রিপোর্টে এসেছে, শুধুমাত্র অক্টোবরে এক উপজাতি খ্রিস্টান পরিবার হামলায় প্রাণ হারিয়েছে, পিগ–ফার্ম ভাঙা হয়েছে, বাড়িঘর পুড়েছে, হামলায় চাপের মুখে অনেকেই নিরাপত্তার সুব্যবস্থা ছাড়াই গ্রাম ছেড়েছে বা আত্মগোপনে গেছে। কিছু এলাকায় চিঠি এসেছিল খ্রিস্টান চার্চে, “এবছর বড়দিনের যেকোনো জমায়েত করলে খারাপ কিছু ঘটবে, প্রস্তুত থাকো, বিদায় বলো।”
যে বাংলাদেশ সবধর্মের অধিকার নিয়ে গর্ব করে, সেখানে খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, উপজাতি, দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য ডিসেম্বর–জানুয়ারি মানে উল্লাস নয়; রাজনৈতিক টানাপোড়েন, “দেশের ভাবমূর্তি” আর সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনীতির ভয়াবহ বৈষম্য। প্রতিবছর নির্বাচন এলেই খুলে পড়ে সংখ্যালঘুদের আবরণ, এক্ষেত্রে খ্রিস্টানদের ওপর চাপ বাড়ে, কারণ নতুন নির্বাচনী সংলাপে ধর্মের সাথে আরবির জন্য আরও কড়াকড়ি আসে, খ্রিস্টিয়ান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে ভয়, উগ্র দলগুলোর মাইক–বক্তৃতিতে জোর। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহুজাতিক মানবাধিকার সংস্থা, খ্রিস্টান সম্প্রদায়গুলো একবাক্যে বলেছে, পরিস্থিতি কয়েক বছরে আরও বিপজ্জনক, ধর্মীয় মৌলবাদীদের প্রচার, নির্বাচনের আগের দুর্বল আইন–শৃঙ্খলা, অপরাধীর শাস্তিহীনতা, সব মিলিয়ে খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের ভয় বেড়েছে।
একজন নাস্তিক, উভকামী নারী হিসেবে দেখলে এই ভয়ের চাদর নিম্নবিত্ত খ্রিস্টান, উপজাতি, নারী, শিশুদের ওপর আরও বেশি গায়ে লাগে। যারা গ্রামে থাকে, চা–বাগানের কুঁড়েঘরে বা ছোট্ট “সেভেন্থ ডে” চার্চের পাশে, তারা নিজেদের ভয় কাউকে বলতেও পারে না, অজানা আক্রমণের আশঙ্কায় প্রার্থনায় কান্না মিশিয়ে গোপন রাখে। বড়দিন রাতে উৎসবের শব্দের চেয়ে দশগুণ বেশি শোনা যায় আতঙ্কের ফিসফাস। আর এই ভয় কেবল ধর্মীয় নয়, এটা রাজনৈতিক। কারা কোনো এলাকার রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নেবে, কোথা থেকে ভোট কাটবে, নিঃস্ব করে রাখাই কারও–না–কারও লাভ, এসব হিসাবেই সংখ্যালঘুর রক্ত ঝরে, ঘর পুড়ে, আর উৎসব গল্প হয়ে যায়।
তেমনি মিডিয়াতে, সরকারি বিবৃতিতে বড়দিনের আগে কিছুদিন পুলিশ মোতায়েন দেখানো হয়, মুখে “সম্প্রীতি” বলার কৃত্রিম প্রচেষ্টা, কিন্তু আঞ্চলিকভাবে নিরাপত্তা কতটা গ্যারান্টি, তা নিয়ে সকলে সন্দিহান। এমনকি কত পরিবার বলেছে, খ্রিস্টমাসে বাড়ি যেতে সাহস পায়নি, অনেক বাবা–মা সন্তানের কাছে আসতে পারেনি, কারণ ভয়: রাস্তায় কেউ ঘেরাও করতে পারে, ফেসবুক পোস্টের জন্য থানায় ডাকা হতে পারে, চার্চে মাথা নোয়ানোর ছবি ভাইরাল হলে “ধর্মান্তরিত” বলে মামলা হতে পারে।
এই বিপন্নতার শেষ নেই, জানুয়ারির নির্বাচন শেষে পরিস্থিতি বদলাবে কি না কেউ জানে না। সংখ্যালঘুদের জন্য ভয়ের চাদর প্রসারিত, বড়দিনের কেক–ক্যান্ডেলের আলোয় আশাবাদ বিভ্রান্ত। ধর্মীয় উৎসব যদি নিরাপদ না হয়, যদি উৎসবে আরও বেশি পুলিশ, হুমকি, নির্যাতনের আশঙ্কা, তাহলে ধর্মীয় স্বাধীনতার দেশ, সম্প্রীতির দেশ, এসব শুধু জাতীয় মিথ। ২০২৩–এর বড়দিন তাই ছিল, ভয়ে ছাওয়া এক নীরব উৎসব; কেবল যিশুর জন্ম নয়, দেশে সংখ্যালঘুদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের আরও এক নির্মম বার্তা।
20 Responses
ভয়ের চাদরে মোড়ানো বড়দিন শিরোনামটাই বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশে খ্রিস্টানদের জন্য বড়দিন মানে শুধু প্রার্থনা আর আনন্দ না, বরং গির্জায় যাওয়ার আগে পুলিশের অনুমতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর কিছু হবে কি না এই দুশ্চিন্তা।
তুই হিন্দু নাস্তিক হয়ে খ্রিস্টানদের পক্ষে লিখছিস, কারণ সবার এক টার্গেট মুসলিম সমাজকে সাম্প্রদায়িক দেখানো। অথচ বাস্তবে বাংলাদেশে অনেক মুসলমানই খ্রিস্টান প্রতিবেশীদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখে; কিছু ঘটনা দিয়ে পুরো সমাজকে অপরাধী বানানো বুদ্ধিবৃত্তিক বেইমানি।
তুমি ভালোভাবে লিখেছ বড়দিনের আগে গির্জায় নিরাপত্তা জোরদার, প্রশাসনের সতর্কতা, গ্রামে খ্রিস্টান পরিবারগুলোকে কম আলো, কম উৎসব করার পরামর্শ এসব দেখায় যে উৎসব উদযাপনের অধিকারও এখানে আর স্বাভাবিক না।
তুই সব সময় সংখ্যালঘুদের ভয়ের গল্প লিখিস, কিন্তু পশ্চিমে মুসলিমদের ওপর যে ইসলামফোবিয়া, হিজাব নিষেধাজ্ঞা, মসজিদে হামলা সেসব নিয়ে তোর কলম নীরব। সব দোষ মুসলিম দেশের, পশ্চিমের সব ভালো এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আর কতদিন?
ভালো লাগল যে তুমি গ্রাম ও শহরের পার্থক্যও এনেছ শহরে কিছু গির্জা, স্কুল, NGO অফিসে ছোট আয়োজন হয়, কিন্তু গ্রামের খ্রিস্টান পরিবারগুলো প্রায় অদৃশ্য হয়ে থাকে, ভয়ে উচ্চস্বরে ক্যারল গাইতে পারে না।
ইসলামি দেশে অন্য ধর্মের উৎসব হবে, কিন্তু সেটা মুসলিম সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। আল্লাহর দেওয়া ইসলাম রক্ষা করা মুসলিমের দায়িত্ব; যদি কেউ ইসলামি মূল্যবোধের বিরুদ্ধে গিয়ে উৎসব করে, তাহলে প্রতিক্রিয়া তো আসবেই।
তুমি যেভাবে ভয়ের চাদর বলেছ এটা শুধু বড়দিনে না, সারা বছরই খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ সংখ্যালঘুরা এই ভয়ের মধ্যে থাকে। উৎসবের সময়টা শুধু আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কারণ তখন তাদের দৃশ্যমানতা বাড়ে।
তুই খ্রিস্টানদের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে লিখছিস, কিন্তু যেসব জায়গায় তারা missionary কাজ করে, ধর্মান্তরণ ঘটায় সেসব ব্যাপারে নীরব। ধর্ম প্রচার করার অধিকার আছে, কিন্তু জোর করে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানোও তো অন্যায়।
ভালো হয়েছে যে তুমি নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকাও এনেছ একদিকে তারা গির্জা পাহারা দেয়, অন্যদিকে অনেক সময় নিজেরাই সংখ্যালঘুদের সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখে। এই paradox টা খ্রিস্টান কমিউনিটির মানসিক চাপ আরও বাড়ায়।
তোর লেখায় সব সময় মুসলিমরাই ভিলেন; খ্রিস্টানরা সবাই নিরীহ ভিকটিম। অথচ ইতিহাসে খ্রিস্টান মিশনারিরা কত দেশে গিয়ে উপনিবেশ, ধর্মান্তরণ, সাংস্কৃতিক নির্মূল ঘটিয়েছে সেটা তুই কখনও লেখ না।
তুমি ঠিকই বলেছ বড়দিনের সময় গির্জায় হামলার ইতিহাস, গাড়ি ভাঙচুর, প্রার্থনা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা এসব আন্তর্জাতিক রিপোর্টেও আছে। নিউজে প্রায়ই দেখা যায়, উৎসবের আগে খ্রিস্টান নেতারা নিরাপত্তা চাইছে।
কিন্তু তুই একবারও বলিস না, অনেক মুসলিম প্রতিবেশী, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন খ্রিস্টানদের সাহায্য করে, রক্ষা করে। শুধু নেগেটিভ দেখালে মনে হয়, পুরো দেশটাই শত্রু; এটা ভুল representation।
ভালো লাগল যে তুমি বাচ্চাদের কথাও এনেছ যারা বড়দিনে নতুন জামা, উপহার, ক্যারল গাইতে চায়, কিন্তু বাবা মা তাদের বলে, বেশি জোরে না, লোকজন শুনবে। এই ভয়টা একটা প্রজন্মের মধ্যে ঢুকে যায়।
তোর লেখা পড়ে মনে হয়, বাংলাদেশে খ্রিস্টানদের কোনো অধিকারই নেই। অথচ সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে, অনেক খ্রিস্টান স্কুল, হাসপাতাল, NGO চলছে। সমস্যা আছে, কিন্তু তুই সেটাকে নির্মূল অবস্থা বানিয়ে ফেলিস।
তুমি যে invisible Christmas বলেছ এটা সত্যি। অনেক খ্রিস্টান পরিবার বাড়িতে ছোট করে ক্রিসমাস ট্রি রাখে, বাইরে থেকে দেখা যায় না; উচ্চস্বরে গান গাওয়া যায় না। এই self censorship ই ভয়ের প্রমাণ।
আল্লাহর কাছে ইসলামই একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন; অন্য ধর্মের উৎসব মুসলিম দেশে কতটা প্রকাশ্যে হবে, সেটা নিয়ে শরিয়ত বেসড discussion হওয়া উচিত। তুই secular চোখে দেখলে সব অন্যায় মনে হবে, কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ভিন্ন চিত্র।
ভালো হয়েছে যে তুমি NGO ও মিশনারি স্কুলের ভূমিকাও তুলেছ তারা অনেক সময় সংখ্যালঘুদের একমাত্র আশ্রয়, কিন্তু একই সাথে তাদের ওপরও চাপ আসে ধর্মান্তরণ বা বিদেশি ফান্ড এর অভিযোগে।
তুই ভয়ের কথা বলছিস, কিন্তু ভয় তো দুইদিকেই আছে মুসলিমরাও ভয় পায়, তাদের সন্তান খ্রিস্টান missionary স্কুলে গিয়ে বিভ্রান্ত হবে কি না। এই উদ্বেগ তুই islamophobia বলে উড়িয়ে দিস, কিন্তু সেটাও একটা বাস্তবতা।
তুমি যেভাবে সাম্প্রদায়িক হামলার ইতিহাস নিয়ে লিখেছ বিগত কয়েক বছরে গির্জায় ভাঙচুর, ক্রস ভাঙা, প্রার্থনা বাধা দেওয়া এসব ঘটনা Human Rights Watch, Minority Rights Group রিপোর্টেও documented আছে।
ভালো লাগল যে তুমি শুধু গির্জা না, ব্যক্তিগত বাড়িতে বড়দিন উদযাপনের ভয়ও এনেছ প