উন্নয়নের মহাসড়কে নারীর লাশের মিছিল

উন্নয়নের এই দেশে যখন মেট্রোরেল চলাচল করছে, ফ্লাইওভারের উপর গাড়ির লাইন বেড়ে যাচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগের খবর সংবাদের প্রথম পাতায়, তখন আমাদের নারীরা কোথায়? তারা কি এই মহাসড়কে স্বাভাবিকভাবে চলছে, নাকি রাস্তার ধারে পড়ে থাকা লাশের মতো? বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রিপোর্ট পড়ে যখন মনে হয়, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতি বছর বাড়ছে, ধর্ষণের ঘটনা ২০২২ সালে ছিল ১১৫৯, গত বছরে সেটা বেড়ে ১২৭৮, আর গার্হস্থ্য নির্যাতনের কথা তো আরও ভয়াবহ, প্রতি দিন গড়ে ৪৫টা কেস রিপোর্ট হচ্ছে, যার মধ্যে অনেকেই মারা যাচ্ছে। এই সংখ্যাগুলো কি কেবল কাগজের হিসাব, নাকি আমাদের উন্নয়নের সাদা চাদরের নিচে লুকানো রক্তাক্ত দাগ?
 
সরকারের ভাষণে শুনি, “ডিজিটাল বাংলাদেশ”, “স্মার্ট বাংলাদেশ”, “নারী ক্ষমতায়ন”, এসব শব্দ যেন একটা জাদুর ছড়ি, যা হাতে ধরলে সব সমস্যা মিলিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে যখন দেখি, একটা নারী তার স্বামীর হাতে পিটে মারা যাচ্ছে যৌতুকের দাবিতে, আরেকটা মেয়ে রাস্তায় ধর্ষিত হচ্ছে কোনো কিশোর গ্যাংয়ের হাতে, তৃতীয়টা তার প্রেমিকের কাছে বিষ খাইয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন এই উন্নয়নের ছড়িটা যেন একটা ধোঁকা, যা নারীদের শরীরকে আরও অসহায় করে তুলছে। মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, নারী হত্যার ঘটনা ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বেড়েছে, আর এর পেছনে আছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, আর সমাজের নীরবতা। এই লাশের মিছিল যেন উন্নয়নের সড়কের পাশে পড়ে থাকা ফসল, যাকে কেউ স্পর্শ করতে চায় না, কারণ সেটা সব গৌরবের ছবিকে নোংরা করে দেবে।
 
আমি নিজে যখন এই খবরগুলো পড়ি, তখন বুকের মধ্যে একটা ক্লান্তি জমে ওঠে। ক্লান্তি কারণ, আমরা বছরের পর বছর একই গল্প শুনছি, একটা মেয়ে তার বাড়ির লোকের হাতে মারা যায়, আরেকটা তার স্বামীর কাছে, তৃতীয়টা অপরিচিতদের দলে। এই সহিংসতার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত রাগ নয়, আছে একটা গভীর সংস্কৃতি, যা নারীকে সম্পত্তি ভাবে, তার শরীরকে নিয়ন্ত্রণের বস্তু ভাবে। উন্নয়নের এই যুগে যখন আমরা মহিলাদের শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতিতে নিয়ে আসার কথা বলি, তখনও গ্রামের একটা মেয়ে তার বাবার সিদ্ধান্তে বিয়ে দেওয়া হয় জোর করে, বা শহরের একটা কর্মজীবী নারী তার অফিসের বসের হাতে পড়ে যৌন নির্যাতনের শিকার। মহিলা পরিষদের মতো সংগঠনগুলো বারবার বলছে, আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই; পুলিশে অভিযোগ করলে উল্টো নারীকেই দোষারোপ করা হয়, আদালতে মামলা চলে বছরের পর বছর, আর শিক্ষক-আইনজীবী-পুলিশের মধ্যে যে পুরুষতান্ত্রিক জাল, সেটা নারীকে আরও গভীরে ঠেলে দেয়।
 
এই উন্নয়নের মহাসড়কে যেন নারীরা শুধু একটা সংখ্যা, জিডিপির শতাংশ বাড়ানোর জন্য কারখানায় কাজ করছে, রপ্তানির জন্য গার্মেন্টসে ঘাম ঝরাচ্ছে, কিন্তু তার ফলাফল যখন পুরুষদের হাতে যায়, তখন তারা আবার ফিরে আসে ঘরের চার দেয়ালে, যেখানে তার স্বামীর মুখোশ খুলে যায় এবং হাত উঠে। আমার নিজের চারপাশে দেখি, বন্ধুবান্ধবের মধ্যে যারা চাকরি করে, তাদের মধ্যে কতজনই না গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। কারণ সমাজ বলে, “সহ্য করো, এটা তো স্বামীর অধিকার।” এই অধিকারের নামে যে লাশের সংখ্যা বাড়ছে, সেটা উন্নয়নের গর্বিত ভাষণে কোথায়? সরকার যখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে নারী শক্তির কথা বলে, তখন কি বলে যে এই শক্তিটা প্রতিদিন তার নিজের ঘরে ভেঙে পড়ছে?
 
আমি উভকামী নারী হিসেবে জানি, এই সহিংসতা শুধু সোজাসাপটা পুরুষ–নারী বিভাজন নয়; এটা যৌনতা, পরিচয়, স্বাধীনতার ওপরও আঘাত। যখন একটা নারী তার ভালোবাসা প্রকাশ করতে চায়, বা তার শরীর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায়, তখন সমাজ আর রাষ্ট্র একসাথে তাকে শাস্তি দেয়, ধর্ষণের অভিযোগ, হত্যা, বা সোশ্যাল মিডিয়ায় গালাগালি। উন্নয়নের এই সড়কে যেন নারীর শরীরই সবচেয়ে বড় বাধা, যাকে দমন করতে হবে যাতে সবকিছু মসৃণভাবে চলতে পারে। মহিলা পরিষদের রিপোর্টে যে ধর্ষণ–হত্যার ঘটনাগুলোর কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে অনেকেই ছিল এমন নারী যারা তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়ছিল, প্রেম করছিল, চাকরি করছিল, প্রশ্ন তুলছিল। এই লাশের মিছিল যেন আমাদের সামনে একটা আয়না, যাতে আমরা দেখতে পাই, উন্নয়নের গতি কতটা নির্মম, কতটা নারী-বিরোধী।
 
সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হচ্ছে, এই সহিংসতার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছে, সেটাও যেন উন্নয়নের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে। মহিলা পরিষদের মতো সংগঠনগুলো রাস্তায় নামছে, মিছিল করছে, আইন সংস্কারের দাবি তুলছে, কিন্তু সেই মিছিলের সামনে পুলিশের লাঠি, মিডিয়ার নীরবতা, আর সরকারের “উন্নয়ন প্রকল্প” এর গর্জন। আমরা যখন নারী হত্যার সংখ্যা বাড়ার কথা বলি, তখন শোনা যায় “এটা ব্যক্তিগত ঘটনা, সরকার সব করছে।” কিন্তু সব করছে মানে কী? আইন আছে, কিন্তু বিচার নেই; পুলিশ আছে, কিন্তু সুরক্ষা নেই; উন্নয়ন আছে, কিন্তু নারীর জীবন নেই। এই মিছিলের শেষে যদি কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে উন্নয়নের এই সড়কটা শুধু নারীদের কবর হয়ে থাকবে।
 
আমার মনে হয়, এই দেশের উন্নয়ন যদি সত্যিই সবার জন্য হয়, তাহলে প্রথমে নারীর শরীরকে নিরাপদ করতে হবে। লাশের মিছিল বন্ধ করতে হবে, না হলে সব গর্বিত ভবন, সব ঝকঝকে রাস্তা, সব বিদেশি টাকা, সবকিছু যেন একটা ফাঁপরের ওপর দাঁড়ানো, যা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। নারীবাদী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, এই সহিংসতার বিরুদ্ধে চুপ থাকা মানে নিজের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করা। উন্নয়নের মহাসড়কে যদি নারীর লাশ পড়ে থাকে, তাহলে সেই সড়কটা আমাদের সকলেরই লজ্জার। এবং এই লজ্জা থেকে বেরিয়ে আসার পথ হল, কণ্ঠ তুলে প্রতিবাদ করা, আইনকে জোরালো করা, আর সমাজকে বদলানো, যাতে উন্নয়নের ছবিতে আর কোনো লাশের ছায়া না পড়ে।

20 Responses

  1. মো. সাইফুল ইসলাম says:

    উন্নয়নের মহাসড়কে নারীর লাশের মিছিল শিরোনামটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে এসব মেগা প্রজেক্ট এর পেছনে কত শ্রমিকের প্রাণ, নারীর বাস্তুচ্যুতি, দুর্ঘটনায় মৃত্যু লুকিয়ে আছে।

  2. আবদুল্লাহ আল মামুন says:

    তুই হিন্দু নাস্তিক বলে উন্নয়নের বিরুদ্ধে লিখিস। পদ্মা সেতু, মেট্রো এসব দেশের জন্য গর্বের; তুই শুধু নেগেটিভ দিক দেখিয়ে বাংলাদেশকে খারাপ দেখাতে চাস। উন্নয়নে কিছু ত্যাগ লাগে, এটা সব দেশেই হয়।

  3. মো. আরিফুল ইসলাম says:

    তুমি ভালো ধরেছ উন্নয়ন নামের আড়ালে যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী শ্রমিক, slum dweller, ছোট ব্যবসায়ী তাদের গল্প কেউ বলে না। inauguration এ minister আসে, ফিতা কাটে, কিন্তু কে মরল, কার ঘর ভেঙে গেল সেটা হিসাবে নেই।

  4. তুই সব সময় শ্রমিক নিপীড়ন বলিস; কিন্তু এই প্রজেক্টগুলো হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান দিয়েছে, যোগাযোগ সহজ করেছে। তুই শুধু negative দেখিয়ে উন্নয়নের বিরোধিতা করছিস এটা দেশের ক্ষতি।

  5. মো. তানভীর হোসেন says:

    ভালো লাগল যে তুমি eviction ও displacement নিয়ে লিখেছ মেট্রো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে হতে গিয়ে কত পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে, ক্ষতিপূরণ পায়নি, নতুন জায়গা পায়নি এসব official report এ আসে না।

  6. উন্নয়নের জন্য কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়; আল্লাহও বলেছেন, বৃহত্তর কল্যাণের জন্য কিছু কষ্ট সহ্য করতে হয়। তুই শুধু ব্যক্তিগত কষ্টের কথা বলিস, জাতীয় স্বার্থের কথা ভাবিস না।

  7. মো. মেহেদী হাসান says:

    তুমি যেভাবে invisible labor নিয়ে লিখেছ যে নারী শ্রমিকরা cement, brick বহন করছে, তাদের নাম কোথাও নেই; কিন্তু তারাই এই bridge, metro তৈরি করছে। inauguration plaque এ minister এর নাম, তাদের নাম নেই।

  8. তুই সব সময় পশ্চিমা human rights language ব্যবহার করিস; কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে দ্রুত development চাইলে কিছু compromise করতেই হয়। পশ্চিমও একসময় এভাবেই develop করেছে; এখন আমাদের lecture দিচ্ছে।

  9. মো. ফারহানুল ইসলাম says:

    ভালো হয়েছে যে তুমি construction accident নিয়েও লিখেছ পদ্মা সেতু, মেট্রোতে কতজন শ্রমিক মারা গেছে, তার সঠিক হিসাব নেই; পরিবারকে compensation দেওয়া হয়নি; অনেক সময় accident কে natural death বানিয়ে দেওয়া হয়।

  10. তোর লেখায় সরকার সবসময় villain; কিন্তু এই প্রজেক্টগুলো দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ, জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। তুই কৃতজ্ঞতা দেখাস না, শুধু fault খুঁজিস।

  11. মো. সোলায়মান হোসেন says:

    তুমি ঠিকই বলেছ উন্নয়ন শব্দটা এখন এমন একটা magic word হয়ে গেছে, যার নামে যেকোনো নিপীড়ন, উচ্ছেদ, শ্রমিক শোষণ justify করা যায়। কেউ প্রশ্ন করলে বলা হয়, তুমি উন্নয়নের বিরোধী।

  12. মো. নাসির উদ্দিন says:

    কিন্তু তুই একবারও বলিস না এই infrastructure development না হলে দেশ পিছিয়ে থাকত। economic growth, job creation, connectivity এসবের মূল্য আছে। শুধু cost দেখালে benefit হারিয়ে যায়।

  13. মো. আরমান হোসেন says:

    ভালো লাগল যে তুমি gender dimension ও এনেছ নারী শ্রমিকদের বেতন পুরুষের চেয়ে কম, তাদের safety gear দেওয়া হয় না, maternity leave নেই; তারা সবচেয়ে বেশি vulnerable, কিন্তু সবচেয়ে কম protected।

  14. তোর লেখা পড়ে মনে হয়, উন্নয়ন মানেই শোষণ; কিন্তু বাস্তবে উন্নয়ন ছাড়া দেশ এগোতে পারে না। সমস্যা হলো, কীভাবে development করা হচ্ছে; সেটা নিয়ে সমালোচনা করলে ভালো, কিন্তু উন্নয়ন নিজেকে খারাপ বললে ভুল।

  15. মো. সাইদুল ইসলাম says:

    তুমি যে বলেছ, মহাসড়কে নারীর লাশের মিছিল এটা খুব তিক্ত, কিন্তু সত্য। construction site এ accident, harassment, non-payment এসবের শিকার বেশিরভাগই নারী ও অদক্ষ শ্রমিক, যাদের কোনো voice নেই।

  16. আল্লাহ দেশের উন্নতি চান, কিন্তু জুলুমের মাধ্যমে নয়; যদি শ্রমিকের হক না দেওয়া হয়, তাহলে সেই উন্নয়নে আল্লাহর বরকত নেই। তুই secular ভাষায় লিখিস, কিন্তু ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এটা অন্যায়।

  17. মো. আজহারুল ইসলাম says:

    ভালো হয়েছে যে তুমি compensation ও rehabilitation নিয়ে লিখেছ যাদের জমি নেওয়া হয়েছে, ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তারা proper compensation পায়নি; অনেককে slum এ গিয়ে থাকতে হয়েছে। এই human cost কেউ count করে না।

  18. তুই শোষণ বলিস, কিন্তু এই শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় কাজ নিচ্ছে; কেউ জোর করে নিয়ে যাচ্ছে না। দারিদ্র্য, শিক্ষাহীনতা এসবই মূল সমস্যা; উন্নয়ন প্রজেক্ট নয়।

  19. মো. কামরুল ইসলাম says:

    তুমি যেভাবে development at what cost প্রশ্ন তুলেছ এটা খুবই জরুরি। infrastructure চাই, কিন্তু কার খরচে? যদি লাখ লাখ মানুষ displaced হয়, শ্রমিক মরে, পরিবেশ ধ্বংস হয় তাহলে সেই development sustainable না।

  20. ভালো লাগল যে তুমি environmental impact ও এনেছ river, wetland ভরাট করে highway, flyover এতে শুধু মানুষ না, পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব development শেষ পর্যন্ত long-term disaster হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *