আমি একজন নারী, বাইসেক্সুয়াল এবং নারীবাদী। আমার পরিচয়ই আমাকে শিখিয়েছে—এই সমাজে নারীর অস্তিত্ব প্রতিদিন সংগ্রামের সমান। এবং ভিন্ন যৌনতা বা পরিচয় থাকলে সেই সংগ্রাম আরও কঠিন হয়। বাংলাদেশে নারীর প্রতি নির্যাতন শুধুমাত্র একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা, যা পিতৃতন্ত্রের গভীর শিকড়ে প্রবাহিত। প্রতিদিন সংবাদে আমরা দেখি—ধর্ষণ, গৃহ নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, রাজনৈতিক সহিংসতা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথম দশ মাসে শতশত নারী হত্যা হয়েছে এবং অসংখ্য নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানগুলো শুধুমাত্র সংখ্যা নয়, প্রতিটি সংখ্যা একটি ভাঙা জীবন, একটি নিঃশেষ হওয়া স্বপ্ন। আমি যখন এই তথ্য পড়ি, তখন মনে হয়—আমাদের সমাজ নারীর যন্ত্রণাকে স্বাভাবিক করে ফেলে। কিন্তু এখানে আরেকটি স্তর রয়েছে, যা প্রায়ই অদৃশ্য থাকে।
আমি একজন বাইসেক্সুয়াল মহিলা হিসেবে জানি, সমাজ কেবল নারীকেই নয়, ভিন্ন যৌনতা ও পরিচয়কেও দমন করে। লেসবিয়ান মহিলাদের প্রায়ই পরিবার থেকে বেদখল করা হয়, ট্রান্স মহিলাদের জনসমাজে শারীরিক এবং মৌখিক সহিংসতার শিকার হতে হয়,এবং বাইসেক্সুয়াল মহিলাদের “অস্থির” বা “অশ্লীল” হিসেবে অপমান করা হয়। এই বৈষম্য এবং নির্যাতন পুরুষতন্ত্রের একটি অংশ, যা নারীর শরীর ও পরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
ধর্ম ও সংস্কৃতির নামে নারীর স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করা হয়। নারীর পোশাক, চলাচল, কণ্ঠস্বর—সবকিছুই ধর্মীয় প্রথার আড়ালে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অথচ নির্যাতনকারীরা ধর্মের নামে নিজেদের অপরাধকে বৈধতা প্রদান করে। আমি বলি, কোনো বিশ্বাসই নারীর কান্নার চেয়ে বড় নয়। নারীর চোখের জল আমাদের সমাজের ব্যর্থতার চিহ্ন। আর যৌন বৈচিত্র্যের নারীদের কান্নাও প্রায়শই শোনা যায় না, কারণ তাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকৃত করা হয়। ধর্ষণকে অনেক সময় আমরা যৌন অপরাধ হিসেবে ভাবি, কিন্তু এটি বাস্তবে ক্ষমতার প্রদর্শন।
পুরুষতন্ত্র নারীর দেহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সমাজে ক্ষমতা বজায় রাখে। গৃহ নির্যাতনও একই কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত—স্ত্রীকে শাসনের নাম করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন আজও সামাজিকভাবে স্বীকৃত। কর্মক্ষেত্রে নারীরা যৌন হয়রানি ও বৈষম্যের সম্মুখীন হন, অথচ অভিযোগ জানালে তাদেরকেই অভিযুক্ত করা হয়।
আমার দৃষ্টিতে নীরবতা হলো সহিংসতার সহযোগী। অনেক নারী সামাজিক লজ্জা বা ভয়ের কারণে অভিযোগ করেন না। এ নীরবতা অপরাধীদের আরও শক্তিশালী করে। তাই নীরবতা ভাঙতে হবে। নারীর শরীর, নারীর কণ্ঠস্বর, নারীর স্বাধীনতা-সবকিছুই তার নিজের। কোনো পুরুষ, কোনো ধর্ম, কোনো প্রতিষ্ঠান তার উপর কর্তৃত্ব করতে পারে না।
বাংলাদেশে নারীর উপর নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু আইন নয়, সামাজিক আন্দোলনও জরুরি। পরিবারে ছেলে শিশুদের নারীবান্ধব শিক্ষা দিতে হবে, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, এবং নারীর মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
সময় এসেছে আমরা সবাই মিলে এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো রাষ্ট্রই টেকসই হতে পারে না। নারীর কান্না থামাতে হলে, আমাদের কলম, কণ্ঠস্বর, এবং প্রতিবাদ জাগ্রত করতে হবে। আর সেই প্রতিবাদে যৌন বৈচিত্র্যের নারীদের কণ্ঠস্বরও সমানভাবে শোনা জরুরি, কারণ তাদের সংগ্রামও আমাদের সংগ্রামের অংশ।
25 Responses
তুমি যেভাবে শুরুতেই বলেছ একটা দেশে যেখানে প্রতি তিনজন নারীর দুইজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সহিংসতার শিকার, সেখানে ব্যতিক্রম না, বরং নিয়মই হলো নির্যাতন এটা VAW ২০২৪ সার্ভের ডেটার সঙ্গে একদম মিলে যায়।
তুই সব সময় মুসলিম সমাজকে নারী নির্যাতনের কারখানা বানাতে চাস। অথচ ঘরে বাইরে সহিংসতা শুধু বাংলাদেশে না, সব দেশেই আছে; পশ্চিমে রেপ, পর্ন, ফ্যামিলি ব্রেকডাউন এসব নিয়ে তোর কলম থেকে কখনো একটা ব্লগও দেখলাম না।
তুমি ভালোভাবে ধরেছ পিতৃতন্ত্র মানে শুধু পরিবারের পুরুষ না; এটা আইন, পারসোনাল ল, উত্তরাধিকার, মোব জাস্টিস সব কিছুর মধ্যে গেঁথে আছে। EUAA আর UK রিপোর্টেও আছে, পারসোনাল ল এর নামে ধর্মীয় বিধান নারীর অবস্থানকে নিচে ঠেলে দিচ্ছে।
তুই সব দোষ ধর্মীয় ব্যাখ্যা আর ইসলামিস্ট দের ঘাড়ে চাপাস, যেন নাস্তিক, সেক্যুলার, লিবারেল পুরুষরা কোনোদিন স্ত্রী, প্রেমিকা, সহকর্মীকে নির্যাতন করে না। বাস্তবে harassment, affair, workplace abuse সব শ্রেণির পুরুষই করে; তুই শুধু ইসলামের নাম এলেই উত্তেজিত হোস।
ভালো লেগেছে যে তুমি নতুন ডেটাগুলোকেও এনেছ UNFPA VAW ২০২৪ সার্ভে বলছে, বেশিরভাগ বিবাহিত নারী জীবনে অন্তত একবার intimate partner violence-এর শিকার হয়েছে, আর খুব কম নারীই কোথাও অভিযোগ করে। এই নীরবতা টাকেই তুমি সেন্ট্রাল পয়েন্ট করেছ।
আল্লাহর আইনকে পিতৃতন্ত্র বলে গালি দিতে তোর লজ্জা করে না? উত্তরাধিকার, মাহর, নিকাহ এসব আল্লাহর হুকুম। কিছু পুরুষ অন্যায় করলে সেটা ইসলামের সমস্যা না; কিন্তু তুই পুরো শারিয়া সিস্টেমকেই নারীর শত্রু বানিয়ে দেখাতে চাইছিস।
তুমি যে ভাবে অফলাইন সহিংসতার সাথে online নির্যাতনটাকেও যুক্ত করেছ ভুয়া আইডি থেকে হুমকি, ডিপফেক, পর্ন এডিট, ডক্সিং এসবকে আজ TFGBV নামে সিরিয়াস ভায়োলেন্স হিসেবে দেখানো জরুরি। VOICE এর রিপোর্টও বলছে, অনলাইন থেকে অফলাইন হামলায় যাওয়ার কেস বাড়ছে।
তুই সব সময় সোশ্যাল মিডিয়ার খারাপ দিকটাই দেখি; কেউ যদি ইসলামের সম্মান রক্ষার জন্য অশালীন পোস্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, সেটাকেও মোরাল পুলিশিং বলে গালি দিস। এভাবে আল্লাহর হারাম হালালকে মাইসোজিনি বানানোই আসল সমস্যা।
তুমি যে CGS এর moral policing রিপোর্টের রেফারেন্স দিয়েছ কক্সবাজারে বিচে মেয়েদের ঘিরে ফেলা, ফুটবল ম্যাচ বন্ধ, পোশাকের কারণে হেনস্তা এসব স্পষ্ট করে যে তাওহিদি জনতা ধরনের দলগুলো নারী বিদ্বেষকে প্রায় বৈধতা দিতে চাইছে।
ঠিক আছে, মোরাল পুলিশিংয়ের বাড়াবাড়ি আছে accept করি। কিন্তু তুই যে ভাবে সবকিছুকে ওয়াহাবি , সালাফি , ইসলামিস্ট বলে এক থলে করে ফেলিস, তাতে মনে হয় তোর আসল সমস্যাই ইসলামি ধারার সাথেই, নির্যাতন ও নির্যাতক দুইয়ের পার্থক্য তোর মাথায় পরিষ্কার না।
তুমি ভালো দেখিয়েছ, রাজনৈতিক টার্নওভার এর পর নারীর ওপর সহিংসতা আরও বেড়েছে বাড়তি ধর্ষণ, মব ভায়োলেন্স, টর্চার, সাম্প্রদায়িক হামলার ভেতরে নারীদের শরীরকে যুদ্ধক্ষেত্র বানানো হচ্ছে। UN gender analysis এও similar প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে।
তোর লেখা পড়ে মনে হয়, যেন পুরোনো সরকারের আমলে সব ভালো ছিল, এখন ইসলামিস্টরা এসে সব নষ্ট করে দিল। অথচ আগের ১৫ বছরেও রেপ, গার্মেন্টসে নির্যাতন, গৃহ সহিংসতা এসব কি কম ছিল? সব দোষ নতুন সরকারের আর ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট দের ঘাড়ে চাপানো intellectually dishonest।
ভালো লেগেছে যে তুমি শুধু ম্যাস রেপ বা sensational কেস না, বরং প্রতিদিনের intimate partner violence, economic coercion, ডাওরি জনিত নির্যাতন এসবকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছ। HRSS, ASK এর কেস ডেটাও দেখায়, সবচেয়ে বেশি মার খায় নিজের ঘরেই।
তুই যখন বলিস, ধর্ম নারী বিদ্বেষের মূল জ্বালানি তখন অন্য সব স্ট্রাকচার দারিদ্র্য, শিক্ষার ঘাটতি, যুদ্ধ উত্তর ট্রমা, দুর্বল বিচারব্যবস্থা এসব সব গায়েব হয়ে যায়। আল্লাহর ওপর দোষ চাপিয়ে মানুষের ব্যর্থতা ঢাকার এই চেষ্টা শয়তানের পুরোনো স্ট্র্যাটেজি।
তুমি LGBTQ+ কমিউনিটির ওপর সহিংসতার প্রসঙ্গ এনে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার সঙ্গে এক ফ্রেমে বসিয়েছ এটা সাহসী। JMBF আর অন্যান্য রিপোর্টও বলছে, কুইয়ার মানুষদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন, ব্ল্যাকমেইল, পুলিশি হ্যারাসমেন্ট বাড়ছে, আইনগত সুরক্ষা নেই বললেই চলে।
তবে মাইন্ড করো, বাংলাদেশে যেখানে সাধারণ মেয়ের নিরাপত্তাই নিশ্চিত না, সেখানে তুই বারবার এলজিবিটি কথাটা ঢুকিয়ে পুরো ইস্যুকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছিস। মানুষের কাছে মনে হবে, নারীর ওপর নির্যাতন টপিকটাকেও তুই পশ্চিমা কুইয়ার এজেন্ডার বাহন বানাচ্ছিস।
তোর problem হলো, পুরুষতন্ত্র বিরোধী কথা বলতে গিয়ে তুই practically পুরুষ বিরোধী ভাষা ব্যবহার করিস। সব পুরুষই যেন নির্যাতক, সব নারীই নির্যাতিত এই binary দিয়ে সমাজকে বোঝা যায় না; ন্যায়বিচারের চোখে সবার হিসাব আলাদা হবে।
তুমি যেভাবে বলেছ, সংস্কারবাদী ইসলামের ভাষা আর ফেনাটিক ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভাষা দুটোর লড়াইও এখন নারীর শরীরে গিয়ে ঠেকছে এটা বাস্তব। কেউ নারীর অধিকার সমর্থন করছে ইসলামিক ভাষায়, আরেক দল ঠিক সেই একই টেক্সট দিয়ে তাকে খণ্ডন করছে।
আবারও, তুই কোনো পজিটিভ ইসলামি প্রচেষ্টা বলিস না যেখানে আলেম, মসজিদ কমিটি, ইসলামি সংগঠনগুলো ডাওরি বিরোধী খুতবা দিচ্ছে, গৃহ সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলছে। এক চোখে দেখলে সবই অন্ধকার, আলোর দিকটা তুই দেখতে চাস না।
তোর লেখায় বারবার ইসলামিস্ট , ওয়াহাবি , মোল্লা এই শব্দগুলো দেখে অনেক সাধারণ ধার্মিক মুসলিমও আঘাত পায়, যারা বাস্তবে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার পক্ষে না। তুই আলাদা আলাদা ক্যাটাগরি না করে সবার মাথায় এক লাঠি মারিস এইটাও একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অন্যায়।
ভালো হয়েছে যে তুমি ইউনাইটেড মিসোজিনি ধরনের প্যাটার্নের কথাও বলেছ ডান বাম, ধর্মীয় নাস্তিক, শহর গ্রাম সব জায়গায় নারীর ওপর সহিংসতার ভাষা প্রায় একই। ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণেও আছে, ভিকটিম ব্লেমিং এ সবাই প্রায় একইভাবে unite।
তুই বলিস ধর্মীয় ব্যাখ্যা , কিন্তু আসলেই কি ইসলামের আসল ব্যাখ্যা এখানে কাজ করছে, না কি সংস্কৃতি, কুসংস্কার আর পুরুষের লালসা? তুই সবকিছুকে ইসলাম বিরোধী প্রোজেক্ট বানালে সেই আলেমরাও keyed up হয়ে ওঠে, যারা আসলে নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারত।
আর্টিকেলে তুমি হামলা ডেটার পাশাপাশি gender backlash এর global প্রেক্ষাপটও টেনে এনেছ Carnegie এর রিপোর্টও বলছে, পরিবার ভ্যালু আর জেন্ডার রাইটস নিয়ে এখন গ্লোবাল যুদ্ধ চলছে, বাংলাদেশ তারই এক local ফ্রন্ট।
ভালো লাগলো তুমি survivors দের সাইলেন্স এর কথাও বলেছ যারা পরিবারের মান সম্মানের ভয়ে কিছুই বলে না, যারা পুলিশে গিয়ে উল্টো হ্যারাসড হয়। UNFPA VAW রিপোর্টও বলে, বেশিরভাগ নারী তাদের নির্যাতনের কথা কাউকে জানায় না এই collective চুপ থাকা ভাঙাই আসল যুদ্ধ।
তবু এটুকু পরিষ্কার এই দেশের নারীরা, queer মানুষরা আর আগের মতো চুপ করে থাকতে চায় না। তোর মতো কড়া ভাষায় না হলেও, আরও অনেকেই এখন পিতৃতন্ত্র, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা আর যৌন বৈচিত্র্যের ওপর হামলার বিরুদ্ধে কথা বলছে এই স্পেসটা বাড়ানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।