৪ নভেম্বর, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার ঝাবড়া এলাকার খালা পাগলী মেলার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাউল শিল্পী আবুল সরকার, যার নামের আগে অনেকে স্নেহভরে ‘মহারাজ’ যোগ করে, সুর আর কথার ভেতর দিয়ে আল্লাহ, সৃষ্টিতত্ত্ব আর মৌলবাদীদের নিয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন। পালাগানের সেই রাতের পুরো ভিডিও এখনো কেউ ঠিকমতো দেখেনি – সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে দু–একটা কাটা ক্লিপ – যেখানে শুনতে পাওয়া যায়, তিনি আল্লাহর সৃষ্টির ক্রম নিয়ে মজার ছলে এক প্রতিদ্বন্দ্বী বাউলকে প্রশ্ন করছেন, আর কোথাও কোথাও মৌলবাদীদের ভণ্ডামি নিয়ে টীকা–টিপ্পনী করছেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই রাতের সুরের জায়গা দখল করে নিল অন্য এক শব্দ – “ব্লাসফেমি”, “ধর্ম অবমাননা”, “তৌহিদি জনতা’র ক্ষোভ” – আর ২০ নভেম্বর রাতে মাদারীপুরের আরেকটি গানের আসর থেকে ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে মানিকগঞ্জে নিয়ে গেল।
পরের দিন, ঘিওর থানার ইমাম মুফতি মো. আবদুল্লাহ একটি মামলা করলেন – দণ্ডবিধির ১৫৩, ২৯৫এ, ২৯৮ ধারায় অভিযোগ: আবুল সরকার নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামকে অপমান করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, উত্তেজনা সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দিতে চেয়েছেন। এই সব ধারার সর্বোচ্চ সাজা দুই বছরের কম, কিন্তু ভাষা এমনভাবে সাজানো, যেন পুরো দেশ তার কথায় কেঁপে উঠেছে; যেন সুরের ভেতর লুকানো দু–একটি প্রশ্নই সমাজে অগ্নিসংযোগের সমান অপরাধ। তাকে দ্রুত আদালতে তোলা হলো, জামিন না দিয়ে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হলো, আর সেই সময়ে মানিকগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে ‘আলেম–উলামা ও তৌহিদি জনতা’ ব্যানারে এক মানববন্ধন–মিছিল চলল, মাইকে গর্জে উঠল, “কঠোর শাস্তি চাই”, “ধর্মের শত্রুদের ফাঁসি চাই।”
এই দৃশ্যটার সঙ্গে আমার অনেক পরিচিত স্মৃতি মিশে যায় – রিতা দেওয়ানের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, শরিয়ত বয়াতির মামলা, লালনের মাজার ঘিরে চিৎকার – সব জায়গায় একই চক্র দেখি: প্রথমে কোনো বাউল বা লোকশিল্পী আল্লাহ–খোদা, সৃষ্টি, স্বর্গ–নরক, পীর–মুরিদ নিয়ে একটু অন্যভাবে বলে; তারপর কোনো মসজিদের ইমাম বা ওয়াজিন ক্লিপটা কাটাছেঁড়া করে ভাইরাল করে; “ধর্ম অবমাননা”র ভাষা তৈরি হয়; তারপর ‘তৌহিদি জনতা’–র ব্যানারধারী মব রাস্তায় নামে, মামলার দাবি তোলে; আর পুলিশ রাষ্ট্রের ‘ধর্মীয় সংবেদনশীলতা’র কাছে মাথা নত করে শিল্পীর গলা টিপে ধরে। আবুল সরকারের ক্ষেত্রে সেটাই হলো – তার সহশিল্পী রাজু সরকার পরিষ্কার বলেছেন, সম্পূর্ণ পারফরম্যান্সের কনটেক্সট না দেখিয়ে কয়েক সেকেন্ডের ক্লিপ ঘুরিয়ে তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দোষী বানানো হচ্ছে; তিনি আল্লাহর বিরুদ্ধে না, মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।
আমার চোখে ভেসে ওঠে নভেম্বরের সেই মানিকগঞ্জের মাঠের আরেকটা ছবি – একদিকে আলেম ও তৌহিদি জনতার মানববন্ধন, অন্যদিকে বাউল অনুসারী, থিয়েটার–কর্মী, সংগীতশিল্পী আর সাংস্কৃতিক কর্মীদের মানববন্ধন; দু’পক্ষের র্যালি যখন একই এলাকায় এসে মুখোমুখি হলো, তখন খবর এলো, তৌহিদি জনতার দিক থেকে কিছু লোক গরিব–কাপড় পরা বাউল–ভক্তদের ওপর লাঠি, স্টিক, লোহার রড নিয়ে হামলা চালিয়েছে, বেশ কয়েকজন আহত, কারও মাথা ফেটেছে, কারও হাত ভেঙেছে। নরওয়েজিয়ান সাপোর্ট–গ্রুপ, Mimeta–র রিপোর্ট, ইউরোপীয় আর্ট–ফান্ডের অ্যালার্ট – সব জায়গায় লেখা, “একটি স্থানীয় ব্লাসফেমি অভিযোগ কয়েক দিনের মধ্যে বৃহত্তর মব–হিংসায় রূপ নিয়েছে, লক্ষ্যবস্তু বাউল ও মরমি সংস্কৃতি।”
এখানে আমার ভেতরের দ্বৈত ক্লান্তি খুব তীব্রভাবে ফিরে আসে। একদিকে, আওয়ামী লীগের যুগে ভাস্কর্য, মাজার, শিল্প, সংস্কৃতি সবকিছু প্রকাশ্যে ব্যবহার হয়েছে পার্টি–প্রচারের মঞ্চ হিসেবে; যারা সরকারের মুখপাত্র ছিল না, তাদেরও অনেককে চুপ থাকতে হয়েছে ভয়ে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার পতনের পর যে ‘ধর্মীয় গণতন্ত্র’ আসার কথা ছিল, সেখানে দেখি, লালন, আজিজ শাহ, ফকির লালন সাই, শাহ আবদুল করিম – এই সুরের ধারার মানুষদের ওপরই আক্রমণ বাড়ছে, “মাজারে গিয়ে ফাতা পড়া হারাম”, “দরগা–সুন্নত নয়”, “বাউলদের গান শিরক” – এইসব স্লোগান নতুন করে জেগে উঠছে, আর একই সরকারের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক ড্রেস কোড, প্রাইমারি স্কুলে সংগীত–শরীরচর্চা শিক্ষক বাতিল, বাউল শিল্পীর ওপর ব্লাসফেমি মামলা – সব একসাথে মিলিয়ে একটা ভয়ংকর ছবিতে পরিণত হচ্ছে।
একজন উভকামী নাস্তিক নারী হিসেবে আমার নিজের বেঁচে থাকার জায়গা বাউল–সুরের ভেতরেই অনেক বার খুঁজে পেয়েছি। লালনের গানে যখন শুনেছি, “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”, তখন মনে হয়েছে, কোনো এক ঈশ্বরকে ভয় না পেয়েও প্রেম আর মানবতায় থেকেও বাঁচা যায়। যখন পরিবার, মসজিদ, সমাজ আমার bisexual পরিচয় আর অবিশ্বাসের কারণে আমাকে “অসুস্থ”, “বিকৃত”, “অশ্লীল” বলেছে, তখনই বাউল গান, লোকনাট্য, রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে নিজেকে মানুষ হিসেবে দেখার একটা ভাষা পেয়েছি। আজ দরগায়, বাউল আখড়ায়, মাজারে আক্রমণ, বাউল শিল্পীদের বিরুদ্ধে মামলা – সব দেখে মনে হয়, যে সামান্য নিশ্বাসের জায়গাটুকু ছিল, সেটাও কেড়ে নিতে চাইছে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। ভারতীয় আর আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলোতে অংশগ্রহণকারী ফারহাদ মজহার, কবি–বুদ্ধিজীবীরা রাস্তা থেকে স্লোগান দিচ্ছেন – “এটা নতুন ধরনের রিলিজিয়াস ফ্যাসিজম, যার যাত্রা ৫ আগস্টের মাজার–দখল থেকে শুরু হয়ে এখন বাউলের গলা টিপে ধরেছে।”
আবুল সরকারের মামলা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে না, দণ্ডবিধির ধারা–নির্ভর – ১৫৩, ২৯৫এ, ২৯৮ – যেমনটা রিতা দেওয়ানের এক মামলায়ও ছিল; এর ভেতরে একটা ধোঁকাও আছে। সরকার বলতে পারে, “দেখুন, আমরা ডিএসএ ব্যবহার করছি না; সাধারণ আইনেই ব্লাসফেমি–জাতীয় অপরাধের বিচার করছি”, যেন এভাবে তারা গণতন্ত্র আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবে একই কাজ হচ্ছে – “ধর্মীয় অনুভূতি”র অস্পষ্ট, সব–খেকো ধারণার ভেতরে যে কোনো ভিন্ন সুর, প্রশ্ন, ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ – সবকিছুকে গিলে ফেলা। ThePrint, NDTV, Hindustan Times, Telegraph–এর রিপোর্টগুলো বলছে, এই মামলার পেছনে Hefazat, খিলাফত মজলিশ, তৌহিদি জনতা – একাধিক ইসলিস্ট গোষ্ঠীর সক্রিয় ভূমিকা আছে; তারা আগেই নারীর ফুটবল, সুফি উৎসব, মাজার–উৎসব বন্ধ করেছে; এখন বাউলদের গানের ভেতরে “ধর্মীয় অপরাধ” খুঁজে বের করছে।
আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর লাগে এই নীরবতা – অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস নিজে কোনো কঠোর বিবৃতি দেননি; তার প্রেস অ্যাডভাইজার একে “দুঃখজনক” বলেছেন, সংস্কৃতি উপদেষ্টা ফারুকী ফেসবুকে লিখেছেন, “ঘটনাটা খুব সেনসিটিভ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাকি সতর্কতার সাথে দেখছে।” অন্যদিকে ওই একই সরকারের অধীনে পুলিশকে এখন পর্যন্ত বাউলদের ওপর হামলাকারী তৌহিদি জনতার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো গ্রেপ্তার বা মামলা করতে দেখা যায়নি; NDTV ও অন্যান্য সূত্র বলছে, আবুল সরকারের ওপর হামলার প্রতিবাদে গঠিত মানববন্ধনে গিয়ে যখন বাউল–সমর্থকদের মারধর করা হয়েছে, তখন কেউ আটক হয়নি। মানে রাষ্ট্র একদিকে ধর্মীয় মবকে রাস্তায় জায়গা দিচ্ছে, অন্যদিকে শাস্তির ভাষা ব্যবহার করছে শিল্পীর বিরুদ্ধে – এই অসম যুদ্ধের ফলাফল আমরা আগেই অনেকবার দেখেছি।
এখানে আবার ফিরে আসে আমার নিজের ব্যক্তিগত প্রশ্ন: এই দেশে কাকে রক্ষা করতে গিয়ে কাকে হত্যা করা হচ্ছে? আল্লাহ যদি সত্যিই থাকেন, সর্বশক্তিমান হন, তবে কি তিনি আবুল সরকারের কণ্ঠস্বরের সামনে এতটাই ভঙ্গুর যে রাষ্ট্রের ডিবি পুলিশ, ওয়াজিন আর তৌহিদি জনতার মিছিলে তাকে রক্ষা করতে হবে? নাকি আসলে এরা আল্লাহকে না, নিজেদের ভঙ্গুর ক্ষমতাকে রক্ষা করছে – যে ক্ষমতা প্রশ্ন সহ্য করতে পারে না, যে ক্ষমতা প্রেমের অন্যরকম ভাষা বুঝতে পারে না, যে ক্ষমতার গায়ে আঁচড় পড়লে মাজার, ভাস্কর্য, গান – সব ভেঙে ফেলার ইচ্ছে জাগে।
বাউলের একতারায় ধর্মের ইমান টলে যায় কি না, সেই প্রশ্ন নিয়ে আমরা রিতা দেওয়ানের কেসে আগেই লিখেছি; আজ আবুল সরকারের গ্রেপ্তার আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে, এই সমাজের ‘ইমান’ টলাটা আসলে একটা রাজনৈতিক প্রজেক্ট। যে ইমান এক টুকরো গান, এক টুকরো মুখোশ, এক টুকরো ভাস্কর্য, এক টুকরো মাজারের ফতেহা সহ্য করতে পারে না, সে ইমান আসলে ভয় আর ঘৃণার ওপর দাঁড়ানো এক ক্ষমতাকাঠামো। সেই কাঠামোর গায়ে আঁচড় দেয় বলেই বাউলদের গলা এত বিপজ্জনক। আর তাই আবুল সরকারের গ্রেপ্তার শুধু একজন শিল্পীর বিচার না – এটা এই রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ডের পরীক্ষা; এই পরীক্ষা আমরা যদি বারবার ফেল করি, তাহলে খুব শিগগিরই গান গাওয়া তো দূরের কথা, নিঃশ্বাস নেওয়ার সুরও আমাদের কাছে সন্দেহজনক অপরাধ হয়ে দাঁড়াবে।
34 Responses
আল্লাহকে রক্ষার দরকার নেই, আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেন এই বেসিক আকিদাটাই আপনি ধরতে পারেননি। বাউল আবুল সরকারের গলা টিপে কেউ আল্লাহকে বাঁচাচ্ছে না, কিন্তু আপনি এমন ভাবে লিখেছেন যেন সব আলেম উলামা শুধু শিল্পীর শত্রু।
আপনার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে, বাউল মানে সব ভালো, আলেম মানে সব খারাপ। অথচ অনেক জায়গায় বাউলের নাম ভাঙিয়ে অবৈধ মাজার, গাঁজা, নারী শোষণও চলে সেই দিকটা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। সিলেকটিভ মানবতা দিয়ে কাজ হবে না।
আল্লাহকে রক্ষা করার নাটক এই ফ্রেইজটা সত্যিই স্পট অন। আমাদের আশেপাশে যারা সবসময় ধর্মের নামে গলা ফুলিয়ে চিৎকার করে, তাদের ভেতরের ক্ষমতালোভ, রাজনীতির লোভ আর কন্ট্রোল ফ্রিক মানসিকতা সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে।
বোন, আপনি আবারও পুরো ইস্যুটাকে ইসলাম বিদ্বেষী ন্যারেটিভে নিয়ে গেলেন। কেউ যদি গানের নামে আল্লাহকে গালি দেয়, ইসলামকে অপমান করে, তার বিরুদ্ধে তো আইনগত ব্যবস্থা হওয়া খুব নরমাল। সবকিছু ফ্যাসিবাদ বানিয়ে দিলে শব্দগুলোরই মান থাকে না।
আবুল সরকারের ভিডিও পুরোটা আমি দেখেছি, সেখানে তিনি সরাসরি আল্লাহকে অপমান না করলেও কিছু জায়গায় সীমা ছাড়িয়ে গেছেন এটা মানতে সমস্যা নেই। কিন্তু তাই বলে গ্রেপ্তার, হামলা, মামলা এই রিঅ্যাকশনটা আপনার মতো আমরাও অস্বস্তিকর মনে করি।
আপনি যেভাবে রিতা দেওয়ান থেকে শুরু করে আবুল সরকার পর্যন্ত একটা ধারাবাহিকতা এঁকেছেন, তাতে বোঝা যায়, এ শুধু একজনের কেস না; এটা সংস্কৃতির ওপর অর্গানাইজড হামলা। এই কানেকশনটা অনেকেই দেখে না, আপনি অন্তত দেখিয়েছেন।
ইসলাম নিয়ে এভাবে লিখশ কেন? তুই মুরতাদ; শরিয়াহ থাকলে তোকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হতো
মাজার, মঙ্গল শোভাযাত্রা, এখন বাউল আপনি চেইন করে যেভাবে সবকিছু কনটেক্সটে এনেছেন, তাতে স্পষ্ট যে এটা কেবল আবুল সরকারের কেস না; একটা পুরো কালচারাল প্লেইন দখল করার চেষ্টা। লেখাটা কঠিন, কিন্তু পড়া দরকার।
আপনার ব্লগে আসলেই ইসলামকে সব সমস্যার মূল হিসেবে দেখানোর একটা হিডেন লাইনে থাকে। এখানে যেমন রাষ্ট্র, আইন, রাজনীতি এসবকে সেকেন্ডারি করে পুরো দোষ ওহাবি সালাফি বলে শেষ। অথচ এই সমাজে অনেক সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষও বাউল শুনে, আপনাকে সেটা নিয়ে কথা বলতে দেখি না।
আবুল সরকারের গ্রেপ্তারের পর বাউল সমর্থকদের ওপর হামলার অংশটা পড়তে গায়ে কাঁটা দিয়েছে। গানের মানুষদের ওপর এমন হামলা দেখে মনে হয়, জঙ্গিবাদ শুধু বোমা ফাটানো না, এটা ধীরে ধীরে গান শিল্প সংস্কৃতির গলা টিপে ধরার প্রজেক্ট।
একটা প্রশ্ন: আপনি কি একবারও ভাবলেন না, গ্রামের সাধারণ মানুষ যারা আল্লাহ রাসূলকে অবমাননা শুনে সত্যিই কষ্ট পায়, তাদের অনুভূতিও একটা বাস্তবতা? তাদের সবাইকে মব বা ফ্যাসিস্ট বলা কি ফেয়ার? আপনি একদিকে গেছেন, মাঝখানে দাঁড়ালেন না।
ইমান টলে যায় কথাটা খুব সুন্দরভাবে উল্টে দিয়েছেন আসলে ভয় পায় রাজনীতি, ধর্ম ব্যবসা আর মোল্লাশ্রেণি, আল্লাহ না। এই লাইনগুলো পড়তে পড়তে নিজের ভেতরের অনেক কনফ্লিক্ট ই ফিল করলাম। সবকিছুতে একমত না, কিন্তু ভাবিয়েছে।
তুই তো শালী নাস্তিক, একদম নরকের কীট। তর মত ব্যভিচারকারীর জন্য আমাদের পবিত্র দেশে কোন স্থান নাই। তোরে এখানে দেখা মাত্র কতল করা হইবে।
মজার লাগে, ইসলামিস্টদের সমালোচনা করতে গিয়ে আপনি কোনো সময়ে বাম ফ্যাসিবাদ, অনলাইন লিঞ্চিং, ক্যানসেল কালচারের কথাই তুলেন না। বাউলের বিরুদ্ধে মামলা খারাপ, ঠিক; কিন্তু ইসলামের বিরুদ্ধে লাগাতার কুৎসাও তো কষ্টদায়ক ওটা নিয়ে আপনার কোনো অনুভূতি নাই?
আবুল সরকারের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে যে ভাবে ফ্যাসিজম ইমার্জিং কথাটা ব্যবহার হয়েছে, সেটা আপনার এই ব্লগের মাধ্যমে আরও ক্লিয়ার হলো। ধর্মের নামে শিল্পীর গলা টিপে ধরা মানে আসলে আমাদের ভবিষ্যৎ কল্পনার সম্ভাবনাগুলোকেই মারার চেষ্টা।
আপনি বারবার বলছেন ওরা আল্লাহকে না, নিজেদের ক্ষমতাকে বাঁচাচ্ছে কিন্তু আপনার নিজের পজিশনও তো ক্লিয়ারলি একপেশে। ধর্মপ্রাণ কারও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আপনি সত্যিই কোনোদিন লেখার চেষ্টা করেছেন? নাকি ইসলাম মানেই আপনার কাছে পাওয়ার স্ট্রাকচার?
ব্লগের যে অংশে লিখেছেন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, প্রশাসন সবাই মৌলবাদীদের সামনে নরম, অথচ বাউলদের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত আইন চালু হয় সেটা একদম চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো সত্য। এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড না বুঝলে কিছুই বোঝা হবে না।
বাউলদের প্রতি আপনার সহমর্মিতা বুঝি, কিন্তু আপনি কখনোই পরিষ্কার করে বলেন না, কোন কথাটা সীমা লঙ্ঘন? সবসময়ই একটা ইম্প্রেশন দেন, যেন কোনো সীমাই থাকা উচিত না। সমাজ রাষ্ট্র ধর্ম সবকিছুরই তো কিছু বাউন্ডারি থাকে।
গ্রামের মেলায় গিয়ে বাউলদের গান শুনেছি, ভালোও লাগে। কিন্তু অনেক সময় দেখি, গানের লাইনে এমন সব কথা চলে আসে, যেগুলো সাধারণ মুসলমানের কাছে খুবই আঘাতের। আপনি এ অংশটা সুন্দরভাবে এডিট করে শুধু রোমান্টিক সাইডটা দেখাচ্ছেন।
সুরের ভেতর প্রশ্ন তোলা আর গলায় হাত রাখা এই কনট্রাস্টটাকে আপনি খুব শক্তভাবে এঁকেছেন। মনে হচ্ছিল, একটা গানকে হত্যা হচ্ছে লাইভ, আর আমরা কীবোর্ডের আড়ালে বসে শুধু নিউজ পড়ে যাচ্ছি।
ইসলামি আইনের আলোচনায় তো আছে, আল্লাহ রাসূল সম্পর্কে ব্যঙ্গ, গালিগালাজ করলে সেটা অপরাধ আপনি কি এসব জানেন না, নাকি ইচ্ছে করে উল্লেখ করছেন না? আপনার পাঠকরা যেন ভাবছে সবকিছু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ , ফিকহি কোনো জটিলতা নেই।
আপনি ঠিকই ধরেছেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন না, পেনাল কোড ব্যবহার করে কেস করছে যাতে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় আইন নরমাল, কিন্তু আসলে একই ব্লাসফেমি প্রজেক্ট। এই লিগ্যাল স্ট্র্যাটেজি নিয়ে বাংলা লেখায় কেউ এভাবে ডিসকাস করছে না।
খানকি মাগি তোকে দেশে পাইলে আগে রাস্তায় সবার সামনে ১০ জন মিলে চুদবো তারপর তোর ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করে ইসলামের ইনসাফ কায়েম করব ইনশাল্লাহ।
আপনার লেখা পড়ে প্রথমবার বুঝলাম, একটা গানের লাইনে আল্লাহকে প্রশ্ন করা আসলে অনেক এলজিবিটি, ভিন্নমত, নিপীড়িত মানুষের ভেতরের প্রশ্নও। তারা তো অনেক সময় আল্লাহকে নয়, সমাজকে জিজ্ঞেস করে আমাকে এমন বানিয়ে রেখে এখন কেন আমাকে মেরে ফেলছ?
আপনার আর্টিকেলে আবুল সরকারের নিজের বক্তব্য বা ডিফেন্স খুব কম এসেছে। সবটাই যেন আপনার ভিউ দিয়ে ফিল্টার করা। যদি সত্যি সাংবাদিকতা ধর্মী লেখা হতে চাইত, তবে অন্তত উভয়পক্ষের বয়ান একটু বেশি স্পেস পেত।
বাউলদের উপর হামলার খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় যাওয়ার পর যে ভাবে ইউনুস সরকার ফান্ডামেন্টালিস্টদের কাছে নত এই ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছে, আপনার লেখা সেই পাজল পূরণ করেছে। রাষ্ট্রের ভয় আর নৈতিক দেউলিয়াপনা একসাথে চলে এসেছে এখানে।
একটা কথা বলি, আপনি যদি সত্যিই মুসলিম হিসেবে জন্ম নেন এবং ধর্ম ছেড়ে থাকেন, তাহলে অন্তত ইসলামের বেসিকগুলো জানেন সেই হিসেবে আরো ব্যালান্সড, informed ক্রিটিসিজম আশা করেছিলাম। এখনকার লেখাগুলো অনেক সময় ফেসবুক র্যান্টের মতো লাগে।
বাউলের গলা টিপে, আসলে আমাদের ভবিষ্যৎ কল্পনাকে টিপে ধরা হচ্ছে আপনার এই লাইনটা সত্যি খুব জোরালো। শিল্পীকে নীরব করলে প্রথমে গান মরে, পরে ধীরে ধীরে প্রশ্ন করার ভাষাও হারিয়ে যায়।
আপনার ব্লগের নিচে এত সমর্থন দেখে মনে হবে, বাংলাদেশ খুবই উদার; আবার বাস্তবে বাউল, লেখক, নাস্তিক, সমকামী যেই একটু কথা বলে, তার জন্য থানায়, রাস্তায়, মাজারে রক্ত পড়ে। এই ডাবল রিয়ালিটিটা আপনি ভালো ফুটিয়েছেন।
ধর্ম নিয়ে এত কথা বলিস কেন? ধর্ম নিয়ে খেললে তোকে কিন্তু মুসলমানরা কখনো মাফ করবে না।
লেখাটা পড়ার পর মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের মৌলবাদ এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও। গান, পোশাক, উৎসব সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে। এ জায়গায় আপনার এই ব্লগ সিরিয়াস ওয়ার্নিং হিসেবেই কাজ করবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বাউল গান পছন্দ করি না, তবু মনে করি, শুধু পছন্দ না বলে কাউকে জেলে ভরার অধিকার কারো নেই। আপনি হয়তো অনেক কথা বাড়াবাড়ি করেছেন, কিন্তু আবুল সরকারের কেসটা অন্যায় এ ব্যাপারে আপনার সাথে একমত।
আপনি আবারও একই ট্র্যাকে ধর্মের নামে যা কিছু হয়, সবই ফ্যাসিবাদ; সংস্কৃতির নামে যা হয়, সবই মুক্তি। বাস্তবতা এত সোজা না। অনেক বাউল শিল্পীও গিরে পড়া পিতৃতন্ত্র, নারীবিদ্বেষ রিইনফোর্স করেন এটা নিয়েও লিখেন কখনো।
শেষ প্যারা পড়ে বুকটা ভারী হয়ে গেল। সত্যি, আমরা গানের গলাটা চেপে ধরে দাবি করছি ইমান রক্ষা করছি। অথচ যার ভেতরে সত্যিকার ঈমান আছে, সে প্রশ্নকেও ভয় পায় না, গানের সুরকেও না। এই পার্থক্যটা আমাদের শেখা দরকার।