অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় অক্টোবরে যে হিসাব সামনে এসেছে তা ভয়ঙ্কর। জানুয়ারি থেকে অক্টোবর ২০২৫ এই দশ মাসে অন্তত ১৬৫ জন মানুষ মব লিঞ্চিং বা গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে আর আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫ পুরো তেরো মাসের হিসাবে এই সংখ্যা ৬৩৭ যাদের মধ্যে ৪১ জন আবার পুলিশেরই সদস্য। কানাডাভিত্তিক গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্সের রিপোর্ট বলছে ২০২৩ সালে যেখানে কেবল ৫১টি মব হত্যার ঘটনা রেকর্ড হয়েছিল সেখানে এক বছরে তা বারো গুণ বেড়েছে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে ক্ষমতা পরিবর্তনের পরকার আইনি শূন্যতা আর বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা মানুষকে “নিজেই বিচারক ও জল্লাদ” হওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এই ৬৩৭ জন নিহতের মধ্যে অধিকাংশই ছিল আওয়ামী লীগ ও তাদের ছাত্র–শ্রমিক সংগঠনের সদস্য বা সমর্থক এছাড়া হিন্দু ও আহমদিয়া মুসলিম সংখ্যালঘু এবং “চোর শিশু অপহরণকারী বা ধর্ম অবমাননাকারী” সন্দেহে সাধারণ মানুষেরও একটি বড় অংশ এই হামলার শিকার হয়েছে। এক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে ৯ জুলাই ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে হিন্দু সমাজকর্মী লালচাঁদ সোহাগকে শত মানুষ মিলে পিটিয়ে হত্যা করে তার মৃত্যু সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভস্ট্রিম করা হয় আবার নারায়ণগঞ্জে গাজী টায়ার্স কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৮২ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যায় যাদের অনেককে আগে থেকেই “দুর্বৃত্ত” আখ্যা দিয়ে কারখানার বাইরে তালাবন্দি করে রাখা হয়েছিল। Rights & Risks আর অন্যান্য বিশ্লেষণ বলছে প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুলিশ হয় ঘটনাস্থলে আসতে দেরি করেছে নয়তো উপস্থিত থেকেও ভিড়ের আক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি পরের ধাপে মামলাগুলোতে অজানা অনেক আসামির নাম দিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে ফলে খুব কম ঘটনাতেই চার্জশিট আর দণ্ড হয়েছে।
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে এই এক বছরের বিচারহীনতাকে দেখি রাষ্ট্র আর সমাজের মিলে গড়া এক ভয়াবহ আয়না হিসেবে। যখন দেখছি রাজনৈতিক প্রতিশোধের নামে কেউ কেউ স্বস্তি পাচ্ছে “অবশেষে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা জনগণের হাতে শাস্তি পেল” বলে তখন ভুলে যাওয়া হচ্ছে একই মব কালকের দিনে কোনো হিন্দু দোকানদার কোনো গরিব তরুণ কোনো মানসিক অসুস্থ পথচারী কিংবা কুইয়ার মানুষকেও “অপরাধী” ভেবে পিটিয়ে মারতে পারে। আইনের শাসন বলতে আমরা যদি শুধু আগের সরকারের ক্রসফায়ার বন্ধ হওয়াকেই বুঝি আর বদলে মব জাস্টিসকে “জনগণের ক্ষোভ” বলে রোমান্টিসাইজ করি তাহলে এই নতুন বাংলাদেশে কারও নিরাপত্তাই থাকবে না কারণ আজকের নীরব দর্শক একটু গুজব কালকের টার্গেট হওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।
31 Responses
নিউ নরমাল শব্দটা এখন নিউজেও দেখি, কিন্তু আপনি যেভাবে এটাকে একেকটা মানুষের শেষ নিঃশ্বাসের সাথে বেঁধে লিখেছেন, সেটা না পড়লে বোঝা যায় না লিঞ্চিং এখন কতটা সাধারণ হয়ে গেছে আমাদের কাছে।
এই লেখাটা পড়লে মনে হয়, আপনি পুরো দেশকে একদম আইনহীন জঙ্গলে পরিণত করে ফেললেন। হ্যাঁ, মব জাস্টিস আছে, কিন্তু আপনি সবকিছুর দায় শুধু নতুন সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন আগের সরকারের টর্চার, ক্রসফায়ার ভুলে গেলেন?
আজকে ওরা সন্দেহভাজন চোরকে মারে, কালকে নাস্তিক, সমকামী, পরশু হিন্দু এই লাইনটা যেন সবকিছুর সারমর্ম। আজকে চুপ থাকলে কালকে আমাদের পালা আসবে এটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
আপনি সবকিছুতেই ধর্ম টেনে আনেন। মব জাস্টিসের পেছনে আইন শৃঙ্খলার অবনতি, বেকারত্ব, অপরাধীর শাস্তি না হওয়া এসব নিয়ে সিরিয়াস আলোচনার বদলে ইসলামিস্ট ব্লাসফেমির প্রসঙ্গেই বেশি গেলেন।
আপনি যে ডেসক্রিপশন দিয়েছেন কেউ ফোনে ভিডিও করে, কেউ ধর শালাকে বলে, কেউ আল্লাহু আকবার চিৎকার দেয় এই পুরো সিনটা এত বাস্তব লেগেছে যে মনে হচ্ছে অসংখ্য ইউটিউব ক্লিপ একসাথে চোখের সামনে চলছে।
একদম একমত না। অনেক সময় পুলিশের কাছে ধরলে ঘুষ দিয়ে ছাড়িয়ে নেয়, তাই মানুষ নিজেরাই বিচারের চেষ্টা করে। সব মব জাস্টিসকে আপনি স্রেফ ফ্যাসিবাদ বলে উড়িয়ে দিতে পারেন না। আইন কাজ না করলে লোকজন তো কিছু করবে।
আপনি খুব ভালো ধরেছেন, আমাদের ভেতরে একটা ভয়ংকর আনন্দ কাজ করে কারো শাস্তি লাইভ দেখে কমেন্ট করতে, শেয়ার করতে। এ আনন্দটা আসলে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার ওপর জমে থাকা ক্ষোভ, কিন্তু বের হচ্ছে ভুল জায়গায়।
মব জাস্টিস সব সরকারের আমলেই ছিল, এখন আপনি হঠাৎ এটাকে পরিবর্তনের পরের বাস্তবতা বানিয়ে শুধু বর্তমান সেটআপকে দোষ দিচ্ছেন। আগের কেসগুলোও এভাবে লিখেছেন কি কখনও? নাকি তখন আপনার কলম এত ধারালো ছিল না?
একটা মানুষ মারা যায়, আর বাকিরা নিজেদের ভিতরের পশুটাকে একটু বেশি মুক্ত করে ফেলে এই বাক্যটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেছি। নিজের ফেসবুক শেয়ার রিঅ্যাকশনগুলোও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
আপনি বারবার ধরেছেন, কিভাবে ‘ব্লাসফেমি’, ‘রাজাকার’, ‘চোর’ এই ট্যাগগুলো দিয়ে যে কাউকে মবের সামনে তুলে দেওয়া যায়। সত্যি কথা, আজকের বাংলাদেশে কাউকে নোংরা লেবেল লাগিয়ে শেষ করে দেওয়া খুব সহজ হয়ে গেছে।
আমার কাছে মনে হয়েছে আপনি ইচ্ছে করে পুলিশের সমস্যা, রিসোর্স ক্রাইসিস, রাজনৈতিক পোলারাইজেশন এসব ইস্যু খুব কম টাচ করেছেন; শুধু রাষ্ট্র মবকে সর্গেট বানিয়েছে লাইনে বেশি গেছেন। সবকিছু এত সোজা না।
লেখাটা যেন প্রতিটা লিঞ্চিং ভিডিওর পেছনের অদৃশ্য ভিড়কে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা কেবল হাত তালি দেওয়া দর্শক নই, আমরা নিজেই আস্তে আস্তে মবের অংশ হয়ে গেছি এই আয়নাটা অস্বস্তিকর, কিন্তু দরকারি।
আপনি আবার ইসলামের ওপর দায় চাপিয়ে দিলেন। মব জাস্টিসের কেসগুলোতে অনেক সময় তো স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিশোধ, প্রোপাগান্ডা, ক্রিমিনাল গ্যাং এসব থাকে, সরাসরি ধর্ম না। আপনি ফ্রেমিংটা ইচ্ছা করেই এভাবে রাখলেন।
আপনি যে কথা বলেছেন একদিন যারা গণতন্ত্রের জন্য লড়েছে , পরদিন ক্যাম্পাসে কাউকে পিটিয়ে মারছে এটা খুবই তিক্ত কিন্তু সত্য। আমাদের ছাত্র রাজনীতির নৈতিক দেউলিয়াপনাটা এরচেয়ে ভালভাবে ধরা কঠিন।
মব জাস্টিসকে নিউ নরমাল বলা একটু বাড়াবাড়ি। অধিকাংশ মানুষ এখনো এই সব ঘটনায় ভয় পায়, সমর্থন করে না। আপনি সোশ্যাল মিডিয়ার উচ্চকণ্ঠ অংশকে পুরো দেশের রিপ্রেজেন্টেশন বানিয়ে ফেলছেন।
আপনি ভালোই বুঝিয়েছেন, রাষ্ট্র যখনই নিরপেক্ষ বিচার দিতে ব্যর্থ হয়েছে ওই শূন্যস্থান দখল করেছে মব। কিন্তু শেষে এসে শুধু রাষ্ট্রকে গালি দিয়ে থেমে গেলেন; কমিউনিটি লেভেল রেজিস্ট্যান্স, স্থানীয় নেতৃত্ব এসব নিয়ে কোনো প্রস্তাব দিলেন না।
আজকে তারা চোরের, কালকে কুফরির, পরশু রাজার সবাইর শাস্তি দেবে এই ধারাবাহিকতার ভেতরে নিজের মুখটাই দেখতে পেলাম। কোনোদিন হয়তো আমি বা আমার পরিচিত কেউও ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়ে সেই বৃত্তের কেন্দ্রে দাঁড়াতে পারি।
আপনার লেখায় একবারও শোনা গেল না গ্রামে, ছোট শহরে মানুষের ভয়, পুলিশে মামলা করলে উল্টো হয়রানি, ঘুষ এসব কারণেই তো অনেকে নিজেদের বিচার করার চেষ্টা করে। আপনি সবসময়ই তাদের শুধু বর্বর বানিয়ে ফেলেন।
লেখার ভেতর যে ক্রস রেফারেন্স দিয়েছেন কোটাবিরোধী আন্দোলনের আর্জেন্ট কোর্ট রায়, তারপর ক্যাম্পাসে লিঞ্চিং, আবার ধর্ম অবমাননার নামে পিটুনি এইসব একসাথে দেখলে বোঝা যায়, ভিন্ন ভিন্ন মব আসলে একই সংস্কৃতি থেকে আসে।
আপনি প্রায়ই আইনের শাসন শব্দটা ব্যবহার করেন, কিন্তু আপনার আর্টিকেলে কোনো লিগ্যাল স্ট্রাকচার, রিফর্ম প্রস্তাব, ইন্সটিটিউশনাল ডিটেইল দেখি না। শুধু মব র্যান্টে থেমে গেলে পাঠকের হাতে করার মতো কিছু থাকে না।
আপনার কথার সাথে অনেক জায়গায় দ্বিমত আছে, তবু এটুকু পরিষ্কার এইভাবে কাউকে মেরে, পরে লাশের পাশে সেলফি তোলা, ভিডিও বানানো এটা কোনোভাবেই জনগণের রাগ বলা যায় না, এটা অসুস্থ আনন্দ। আপনি সেটা ভালো ধরেছেন।
আপনি ধর্ম, রাজনীতি, সংখ্যালঘু, নারী, সমকামী সবকিছুর ওপর মবের প্রভাবকে একসাথে দেখিয়েছেন, এটা স্ট্রেংথ। কিন্তু এতগুলো লেয়ার এক লেখায় গুঁজে দেওয়ায় কখনো কখনো পয়েন্টগুলো ডিফিউজ হয়ে গেছে। ছোট ছোট সিরিজ করলে ভালো হত।
দল খালাস, মব খালাস, শুধুই লাশের দোষ ছিল এই স্যাটায়ারিক লাইনটা বারবার মনে পড়ছে। আসলে আমরা সব সময়ই ভিকটিমকে সন্দেহ করি, মবকে না। এই মানসিকতা ভাঙাটাই সবচেয়ে কঠিন।
আপনার আগে থেকেই রাষ্ট্র নিয়ে ক্ষোভ আছে, তাই সব সমস্যার রুট কজ হিসেবে স্টেট ফেইলিওর দেখেন। কিন্তু পরিবার, মসজিদ, স্থানীয় নেতাদের রোলও তো আছে এই হিংসায়। শুধু ঢাকায় বসে কাঠামোগত কথা বললে হবে?
যে অংশে লিখেছেন আজ মবের হাতে পুলিশের ইউনিফর্মের বদলে স্মার্টফোন সেটা অন্যরকমভাবে নাড়া দিয়েছে। আগে ভয় ছিল লাঠিধারী পুলিশের, এখন ভয় সবাইকে; যে কোনো ভিড়ই সম্ভাব্য গনবিচার।
টেকনিক্যালি, আপনি অনেকগুলো উদাহরণ এনেছেন কিন্তু স্পেসিফিক রেফারেন্স দেননি কোন তারিখে, কোথায়, কাকে মারা হয়েছে। রিসার্চ বেসড না হয়ে গেলে এগুলো অনেকের কাছে ওভারস্টেটমেন্ট ঠেকতে পারে।
আপনি ঠিকই বলেছেন, যারা গতকাল রাস্তা কাঁপিয়েছে গণতন্ত্র বলে, আজ তারাই ভোট বিরোধী, ভিন্নমত বিরোধী, কুচক্রী বলে লেবেল লাগিয়ে মানুষের গায়ে হাত তুলছে। বিপ্লব আর লিঞ্চিংয়ের এই সরু রেখাটা আমরা বুঝিনি।
সবকিছুর শেষে এসে আপনার প্রশ্ন এই দেশে আমার শরীরটা কার? শুধু নারী বা সমকামীর না, বরং প্রতিটা নাগরিকের প্রশ্ন হয়ে গেছে। মব যখন রাস্তায় বিচার করে, তখন আইডেন্টিটি আগে, মানবিকতা পরে আপনি সেটা ভালোভাবে দেখিয়েছেন।
তবে একটা কথা বলব আপনি যে কণ্ঠে কথা বলছেন, সেটা খুবই শহুরে, মধ্যবিত্ত; গ্রাম্য প্রেক্ষাপটে যেখানে থানা কোর্টে ন্যায্য বিচার পাওয়াই প্রায় অসম্ভব, সেখানে মানুষের অনুভূতি নিয়ে একটু বেশি এমপ্যাথি দেখালে ভালো হতো।
আপনার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল অন্ধকার। কোনো পজিটিভ রেজিস্ট্যান্স, কমিউনিটি সলিডারিটি, মানুষের প্রতিরোধ এসবের উদাহরণ আনেননি। সবকিছু এত hopeless করলে পাঠকও ক্লান্ত হয়ে যায়।
তারপরও এই লেখাটি দরকার ছিল, কারণ আমরা প্রতিটা নতুন লিঞ্চিংকে এক দিনের নিউজ বানিয়ে ভুলে যাই। আপনি অন্তত সেই সব ঘটনা এক সুতোয় গেঁথে দেখিয়েছেন, এটা নিউ নরমাল এখনও না বুঝলে দেরি হয়ে যাবে।