আগস্টের শুরুতে কয়েকটি টিভি টকশো আর অনলাইন পোর্টাল যে ভাষায় কুইয়ার মানুষদের নিয়ে কথা বলতে শুরু করল তা যেন আগুনে ঘি ঢালারই সামিল। এক জনপ্রিয় বেসরকারি চ্যানেলের স্ক্রোলবারে চলছিল “দেশে রকেটের গতিতে বাড়ছে সমকামিতা” আর সঙ্গে স্টুডিও আলোচনায় অতিথিরা বলছিল “ইউটিউব সিরিজ ফেসবুক গ্রুপ আর বিদেশি এনজিওর টাকায় তরুণদের বিপথে নেওয়া হচ্ছে” এমনকি কেউ কেউ সরাসরি দাবি করল সমকামী হওয়া নাকি “মানসিক রোগ” “সংক্রামক প্রবণতা” যা যদি এখনই রুখে না ধরা হয় তবে পরিবার সমাজ রাষ্ট্র সব ভেঙে পড়বে। JusticeMakers Bangladesh in France এর প্রতিবেদন বলছে ২০২৪ সালের এলজিবিটিকিউ সহিংসতার ৭০টি ঘটনার খবর কীভাবে কভার হয়েছে তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে মিডিয়ার ৫৮ শতাংশ রিপোর্টেই কুইয়ার মানুষদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বাকিদের অপরাধী বিকারগ্রস্ত বা ধর্মবিরোধী হিসেবে ফ্রেম করা হয়েছে।
ভয়েস নামের এক গবেষণা প্রজেক্ট অক্টোবর ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত ছয় মাসের টেলিভিশন ও অনলাইন কনটেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে লিঙ্গ বৈচিত্র্য ও কুইয়ার মানুষের বিরুদ্ধে “লিঙ্গভিত্তিক বিভ্রান্তিমূলক প্রচার” ক্রমশ বেশি হচ্ছে বিশেষ করে ফেসবুক ইউটিউব আর টকশোতে। এসব কনটেন্টে দুই ধরনের ফ্রেম সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে এক সাংস্কৃতিক আতঙ্ক অর্থাৎ “সমকামিতা পশ্চিমা ষড়যন্ত্র” অন্যটি নৈতিক আতঙ্ক “যদি এখনই কড়া আইন না আনা হয় তাহলে অল্পদিনেই দেশের অর্ধেক যুবক সমকামী হয়ে যাবে” ইত্যাদি; কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই কোনো কুইয়ার ব্যক্তির কণ্ঠ নেই শুধু ভয়ের গল্প আর ধর্মীয় ভাষায় সজ্জিত ঘৃণা। এর ফল কী হয়েছে সেটাও একই রিপোর্টে ধরা পড়েছে কুইয়ারদের ওপর হামলা প্ররোচনামূলক ফেসবুক পোস্ট বা মসজিদের মাইকে গুজব ছড়ানোর সঙ্গে এসব মিডিয়া ন্যারেটিভের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে আর ভিকটিমদের অনেকেই বলছেন হামলাকারীরা আগেই টিভিতে বা অনলাইনে “এই সবের বিরুদ্ধে জিহাদ”–ধর্মী কথা শুনে উত্তেজিত ছিল।
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে এই সব “রকেট গতির” গল্পের ভেতরে নিজের অস্তিত্বকেই বিদ্ধ হতে দেখি। আমাদের সম্পর্কে মিথ্যা আর আতঙ্ক ছড়িয়ে যারা ক্লিক ভিউ বা রাজনৈতিক পয়েন্ট তুলছে তারা খুব ভালো করেই জানে এইসব ভাষা রাস্তায় কেমন হিংসা খুলে দেয় পুলিশ প্রশাসন পরিবার সমাজ সবাইকে কেমন করে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। অথচ সত্যিটা ঠিক উল্টো আমাদের সংখ্যা আচমকা বেড়ে যায়নি আমাদের ভালোবাসা আচমকা জন্মায়নি বদলেছে শুধু ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে একে অপরকে খুঁজে পাওয়ার রাস্তা আর সামান্য কিছু সাহস তাই মিডিয়ার কাজ হওয়ার কথা ছিল তথ্য দেওয়া মানবিক করা নিরাপদ স্পেস খুঁজে দেওয়া কিন্তু তারা যখন উল্টো আতঙ্কের ভাষায় “সমকামিতা মহামারি”র গল্প বানায় তখন বোঝা যায় এই দেশে কুইয়ার মানুষ হওয়া মানে এখনো শুধু ভালোবাসা বেছে নেওয়া নয় বরং প্রতিটি খবরের শিরোনামে নিজের অস্তিত্বকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো দেখে বেঁচে থাকা।
31 Responses
টিভিতে যে ভাবে থার্ড জেন্ডার ডিবেট নাম দিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সার্কাস বসানো হয়, আপনার লেখায় সেই ভণ্ডামিটাই ধরা পড়েছে। ভিকটিমের মুখ ঝাপসা, কিন্তু তাদের ওপর হাসাহাসি পুরো দেশ দেখে এটাই আমাদের মিডিয়া।
আপনি সব সময় মিডিয়াকে দায় দেন, কিন্তু ভুলে যান, এগুলোও তো ব্যবসা। যে কন্টেন্টে TRP আসে, তারা সেটাই দেখায়। মানুষ যদি সমকামিতা নিয়ে সেনসেশনাল কিছু দেখতে না চাইত, চ্যানেলগুলোও করত না। দোষটা শুধু মিডিয়ার না।
একজন কিশোরের আত্মহত্যার নোট থেকেও হেডলাইন বানানো এই অংশটা পড়ার পর সত্যিই গা শিউরে উঠল। যারা এইসব খবরে ক্লিক, কমেন্ট করে, তারাও আসলে সেই একই গর্হিত খেলায় অংশ নিচ্ছে।
সমকামিতা ইসলাম অনুযায়ী স্পষ্ট হারাম এটা আপনি জানেন। এইটার আইনি ধর্মীয় রায় আলোচনা না করে শুধু মিডিয়াকে দোষ দিলে হবে? টকশোতে আলেমরা কথা বলবেনই, আপনি সেটা পুরোটা হেট স্পিচ বানিয়ে দিচ্ছেন।
আপনি যে উদাহরণ দিয়েছেন নাইজেরিয়ার অ্যান্টি LGBT আইন নিয়ে ডকুমেন্টারি থেকে ক্লিপ কেটে বাংলাদেশে গে বিয়ের চক্রান্ত বানানো শুনে হাসব নাকি কাঁদব বুঝি না। এই লেভেলের মিথ্যাচার সত্যিই মারাত্মক।
সমকামিতাকে প্রমোট করা পশ্চিমা মিডিয়ার দায় নিয়ে কখনও কেন লেখেন না? তারা যে আমাদের সমাজে নতুন নতুন কনফিউশন ঢুকাচ্ছে মিডিয়ার ওই সাইডটা নিয়েও আলোচনা দরকার ছিল। সব দায় লোকাল মিডিয়ার ঘাড়ে?
ভালো লাগল যে আপনি শুধু বিরোধী দল ঘনিষ্ঠ পত্রিকা নয়, সরকারপন্থী চ্যানেলের নাম না নিয়ে হলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন সব পক্ষই LGBT ইস্যুতে একইভাবে ক্লিকবেট খেলায় মেতেছে। কারও কাছে আমরা মানুষ না, শুধু কনটেন্ট।
আপনি মাঝে মাঝে এমন লিখেন যেন এলজিবিটি মানুষজন কোনো ভুল করে না, সব ভুলই মিডিয়া আর সমাজের। মিডিয়া যদি আপনাদের এজেন্ডা প্রচার করত, তখন কি আপনি এটাকে দায়িত্বশীল বলতেন? ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আছে।
একটা হ্যাশট্যাগ দেওয়া হয়, আর পুরো একটি কমিউনিটিকে দানব বানিয়ে ছাড়ে এই বাক্যটা একদম বাস্তব। সোশ্যাল মিডিয়া বেইজড নিউজ পোর্টালগুলো তো এখন গুজবকে ফ্যাক্ট বানিয়ে দেয়, বিশেষ করে কুইয়ার বিষয় এলে।
আপনার লেখা পড়ে আবার মনে হল, আমাদের দেশের অনেক সাংবাদিকের কোনো ট্রেনিংই নেই জেন্ডার ও সেক্সুয়ালিটি ইস্যুতে। WHO, APA কত আগে বলেছে এটা রোগ না; অথচ আমাদের টকশো এখনো সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নেওয়া উচিত কি না নিয়ে।
আপনি ধর্মীয় পত্রিকাগুলোর সমালোচনা করলেন, কিন্তু কখনও ভাবলেন না, তাদের পাঠকের দৃষ্টিতে সমকামিতা সত্যিই অপরাধ মনে হয়। ওই রিডারদের সেনসিটিভিটিকে একদমই পাত্তা না দিয়ে লেখলে টানাপোড়েন তো বাড়বেই।
Daily Sangram এর হোমোফোবিক রিপোর্ট নিয়ে যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করেছিল, আপনি সেটা রেফার করে ভালো করেছেন। দেখা যাচ্ছে, সংবাদপত্রের একটা লেখা সরাসরি কুইয়ার মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সবকিছুর শেষে মনে হয়, আপনি আসলে মিডিয়াকে hate crime-এর পার্টনার হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু মিডিয়ার ভেতরেও তো অনেক প্রগ্রেসিভ সাংবাদিক আছেন, যারা লাইফ রিস্ক নিয়ে রিপোর্ট করেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা’টা লেখায় কম।
আপনার কথা ঠিক প্রতিবার সমকামিতা শব্দটা আসতেই ক্যামেরা হিজড়া কমিউনিটির দিকে ঘুরে যায়, যেন সব LGBT মানেই হিজড়া। এই কনফিউশনটা মিডিয়াই তৈরি করেছে, আর এর জন্য বাস্তবে হিজড়া ও কুইয়ার দু’পক্ষই মার খাচ্ছে।
আপনি লিখেছেন, টকশোতে একজন গে অতিথি মানে যেন সার্কাসের নতুন পশু লাইনটা খুব কষ্টদায়ক, কিন্তু সত্যি। প্রশ্নগুলোও থাকে হালকা আশ্লীল, মজা নেওয়ার টোনে, যেন মানুষ না, বিনোদনের উপকরণ।
আপনি কেন বারবার ইসলামিস্ট পত্রিকা শব্দ ব্যবহার করেন, কিন্তু সোজা Jamaat লিঙ্কড পেপার, তাদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা, ফান্ডিং, পার্টি লাইন এসব পরিষ্কার করে বলেন না? সাহস কোথায় গিয়ে থেমে যায়?
আপনি মেইনস্ট্রিম মিডিয়া নিয়ে যতই বলুন, অনলাইন পোর্টাল আর ইউটিউব চ্যানেলগুলোর ভূমিকা আরও ভয়ংকর। গে ধরা পড়ল , লেসবিয়ান বিয়ে ভেঙ্গে গেল এই শিরোনামগুলো আসলে পুরো সমাজকে জ্বালানি দেয়। আপনি ঠিক ধরেছেন।
আমার মনে হয়, আপনি ইচ্ছে করে কোনো পজিটিভ উদাহরণ আনেননি যেমন, কিছু নিউজ পোর্টাল যারা fairly রিপোর্ট করেছে, কুইয়ার মানুষের স্টোরি প্রপার কনটেক্সটে দিয়েছে। সবকিছু কালো দেখালে মানুষ আশা হারায়।
সেক্সুয়াল ডিভিয়েশন শব্দটা ব্যবহার করে যে সব টকশো চলে, সেখানে আপনার মতো কেউ পাল্টা গিয়েছে কি? শুধু ব্লগে লিখলে হবে না; সমাজ ও মিডিয়ার মাঝের সেতুতে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হবে। আপনি কি সেই স্পেসটায় যাবেন?
২০২৪ সালের রিপোর্টে যে দেখানো হয়েছে খবরের ৫৮% কুইয়ারদের নেতিবাচকভাবে তুলে ধরে এই স্ট্যাটটা আপনার যুক্তিকে খুব ভালো ব্যাক করেছে। স্রেফ অনুভূতি না, সংখ্যাও বলছে আমাদের মিডিয়া হোমোফোবিক।
আপনি মিডিয়ার irresponsible দিক শুধু একপাশ দেখে বলেছেন। ওরা স্ট্রেইট মানুষদের অনৈতিক সম্পর্ক, পরকীয়া এসব নিয়েও একইভাবে সেনসেশন বানায়। তাহলে কি ওখানেও হেট ক্রাইম বলবেন? নাকি কুইয়ার ইস্যুতে আলাদা মানদণ্ড?
যে অংশে লিখেছেন, সংবাদপত্র ফতোয়ার ভাষা কোট করে অথচ কোনো কুইয়ার বা সাইকোলজিস্টের বক্তব্য নেয় না সেটা আমাদের সাংবাদিকতার একচোখা চরিত্র তুলে ধরে। দুই পক্ষের কথা শোনার বেসিক নীতিও মানে না অনেকেই।
আপনার লেখায় বারবার হেট , ফ্যাসিজম , ডিমানাইজিং এই শব্দগুলো এত বেশি এসেছে যে কোথাও কোথাও ওভার ড্রামাটিক লাগছে। মিডিয়া খারাপ কাজ করছে, কিন্তু সব সাংবাদিককে দানব বানানো ঠিক না।
নিজেদের বাঁচাতে এলজিবিটি মানুষদের আরও গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে মিডিয়া এই কনক্লুশনটা খুব শক্ত। অনেকেই বুঝতে চায় না, প্রতিটা খারাপ রিপোর্ট মানে হলো, কোনো একজন কুইয়ার ব্যক্তি আরও এক ধাপ সেফটি হারাল।
আপনি সব সময় পশ্চিমা মেডিক্যাল সোসাইটি, WHO, APA এর কথা বলেন; আমাদের দেশের আলেম, সমাজবিজ্ঞানী, কাউন্সেলরদের থিংকিংকে একদমই পাত্তা দেন না। এই ইগনোরেন্স থেকে অনেক কনফ্লিক্ট তৈরি হয়।
মিডিয়া শুধু প্রোপাগান্ডা না, শিক্ষা দেয় এই কথাটা সত্যি। যতক্ষণ পর্যন্ত টিভি অনলাইন সমকামী ট্রান্স মানুষদের নিয়ে ভয় বিদ্বেষের গল্প চালিয়ে যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আইনের বদলও খুব কিছু করতে পারবে না।
ব্লগে আপনি কয়েকটা ভালো প্র্যাকটিসের পরামর্শও দিয়েছিলেন কনফিডেনশিয়ালিটি, consent, ভিকটিম সেন্টারড রিপোর্টিং। এগুলো মিডিয়া হাউজগুলো অ্যাডাপ্ট করলে সত্যিই বড় পার্থক্য আসতে পারে। শুধু সমালোচনা না, সলিউশনও ছিল।
কিন্তু একটা কথা থেকে যায় যে দেশে অনলাইনে গালি, ডক্সিং, হুমকি নর্মাল, সেখানে মিডিয়ার ওপর এত দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে কতটা রিয়ালিস্টিক হবে? সোশ্যাল মিডিয়া ইউজারদের ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে লেখা দরকার।
আপনি যে গল্পটা শেয়ার করেছেন একটি বেসরকারি চ্যানেলে বিশেষ অনুসন্ধান সমকামীতার ছড়াছড়ি সেটার ক্লিপ আমিও দেখেছি। ওরা যেভাবে গান, ফ্যাশন, আর্টের মানুষের পিছনে ক্যামেরা নিয়ে ধাওয়া করছিল, সত্যিই বীভৎস।
আপনার লেখার টোন খুবই কনফ্রন্টেশনাল। হয়তো অন্য কোনো ভাষায়, কম আক্রমণাত্মক শব্দে বললে হোমোফোবিক মিডিয়া ওয়ার্কারদের কেউ কেউ আত্মসমালোচনা করত। এখন তো তারা আপনাকে দেখেই এনজিও এজেন্ট বলে ডিসমিস করবে।
তারপরও, কারও না কারও তো এই কথা বলতে হতো যে সমকামিতা নিয়ে আমাদের মিডিয়ার দেয়াল লেখাগুলো প্রায়ই মানুষের রক্ত দিয়ে লেখা হয়। আপনার ব্লগ অন্তত সেই রক্তের কথা উচ্চারণ করেছে, এই জন্যই জরুরি।