৩ মে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে জনসমুদ্র দেখা গেল তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নারীদের অধিকার আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের ডাক। হেফাজতে ইসলাম ঘোষিত গ্র্যান্ড র্যালিতে সকাল থেকেই হাজার হাজার মাদরাসা ছাত্র আলেম ও সমর্থক জড়ো হয়েছিল তাদের হাতে ব্যানার নারী উন্নয়ন নীতি বাতিল করো নারীবিরোধী নয় কোরআনবিরোধী কমিশন ভেঙে দাও আর কণ্ঠে একই সুর নারীর সমান উত্তরাধিকার পশ্চিমা কুফরি ধারণা নারী পুরুষ সমান হতে পারে না। সমাবেশ শেষে যে ১২ দফা ঘোষণা পড়ে শোনানো হয় তার মধ্যে ছিল উইমেন্স অ্যাফেয়ার্স রিফর্ম কমিশন বাতিল কমিশনের রিপোর্ট ছিঁড়ে ফেলা সংবিধান থেকে pluralism শব্দ বাদ দিয়ে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর আর ২০২৪ সালের জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি এবং ধর্ম অবমাননার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তিসহ নতুন ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই সমাবেশকে নারী অধিকার ও মতপ্রকাশের ওপর সরাসরি চাপ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে হেফাজত শুধু নারী কমিশন নয় বরং গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সেই সুপারিশও বাতিল করতে চায় যেখানে ব্লাসফেমি–ধরার অপব্যবহার রুখতে আইনি পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল। সমাবেশে একাধিক বক্তা নারী কমিশনকে “বেশ্যা কমিশন” আখ্যা দিয়ে তার সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেয় এমনকি এক পর্যায়ে নারী প্রতিকৃতির কুশপুতুল এনে জনতার সামনে আঘাত করা হয় যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস আর অন্যান্য পত্রিকা লিখেছে এই র্যালিতে নারীদের পোশাক চলাফেরা কর্মজীবন এবং যৌন অধিকার নিয়ে অত্যন্ত অবমাননাকর ভাষায় কথা বলা হয়েছে যা শুধু নারীদের নয় পুরো সমাজের জন্য অপমানজনক আর সহিংসতাকে উৎসাহিত করার মতো।
একজন উভকামী নাস্তিক নারীবাদী নারী হিসেবে সেদিনের শাপলা চত্বরের হুঙ্কারকে দেখি কেবল হেফাজতের এক রাজনৈতিক শোডাউন হিসেবে নয় বরং রাষ্ট্রের নীরবতা আর দোদুল্যমানতার ফল হিসেবে যেখানে নারী ও কুইয়ার অধিকারের যেকোনো অগ্রগতি সবসময়ই আলোচ্য তালিকার শেষ দিকে থাকে। হেফাজত যখন নারী কমিশনকে “কোরআনবিরোধী” ঘোষণা করে ব্লাসফেমি আইনের দাবিতে গলা ফাটাচ্ছে তখন অন্তর্বর্তী সরকার একদিকে আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছে নারী ক্ষমতায়নের গল্প শোনায় অন্যদিকে মাঠের এ বাস্তবতায় স্পষ্ট ভাষায় দাঁড়াতে ইতস্তত করে যা উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে আরও উৎসাহিত করে। নারীর সমান উত্তরাধিকার যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর আইন সেক্স ওয়ার্কারদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি অথবা কুইয়ার মানুষের ন্যূনতম মর্যাদা এগুলো কোনো “বিলাসিতা” না এগুলো ছাড়া গণতন্ত্র আর মানবাধিকার কেবল কাগুজে বুলি হয় তবু যখন দেখি এই সব প্রশ্নের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা লোকদের মঞ্চই শহরের সবচেয়ে বড় আরতালিকা হয়ে ওঠে তখন সত্যিই মনে হয় নতুন বাংলাদেশের রাস্তায় নারীদের চলার পথ এখনও আগের মতোই কাঁটা বিছানো।
26 Responses
শাপলা চত্বরের হুঙ্কার বলে তুমি আবার হেফাজতকে দানব বানালে, অথচ ওদের দাবি ছিল কোরআন সুন্নাহ বিরোধী কমিশন বাতিল করা। ধর্মীয় দৃষ্টিতে সমস্যার জায়গাটা নিয়ে তুমি এক লাইনেও সৎ আলোচনা করনি, শুধু ইসলামবিদ্বেষী ঘৃণা ছুড়েছ।
তুমি হিন্দু নাস্তিক মেয়ে হয়ে সুন্নি আলেমদের ‘নারীর শত্রু’ বানিয়ে লিখছ, সাবধান থাকো। আল্লাহর কিতাবের সাথে যুদ্ধ করে কোনোদিন শান্তি পাবে না আল্লাহর কাছে তোমার এই লেখাগুলোর হিসাব খুব কঠিন হবে।
ভালো লাগল যে তুমি পরিষ্কার করে দেখিয়েছ, শাপলা চত্বরের ভাষণ শুধু নারীর অধিকারের বিরুদ্ধে না; আসলে পুরো নারী কমিশন, সমতা, উত্তরাধিকার, এমনকি কুইয়ার ও থার্ড জেন্ডার শব্দের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা। এটা সরাসরি জিহাদি পলিটিক্স।
তোমার লেখা পড়ে মনে হলো, নারী কমিশন মানেই ফেরেশতা আর হেফাজত মানেই শয়তান। কমিশনের রিপোর্টে যে পশ্চিমা স্টাইল ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড, ইনহেরিটেন্সে আল্লাহর অংশ বদলানো এসব ছিল, সেগুলোর ওপরও তো ইসলামের আলোকে আলোচনা হতে পারে।
তুমি ঠিকই ধরেছ ২০১৩ র শাপলা চত্বর আর ২০২৫ এর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের র্যালি আসলে একই ধারাবাহিকতার অংশ। তখন ব্লাসফেমি আইন আর ১৩ দফা, আর আজ নারী কমিশনকে বেশ্যার কমিশন বলে গালি ভাষা বদলালেও মনোভাব বদলায়নি।
নাস্তিক মনোভাবওয়ালা মেয়েরা যেন আলেমদের ঈমান নিয়ে লেকচার দিচ্ছে দৃশ্যটা সত্যি করুণ। তুই আল্লাহকেই মানিস না, আবার আল্লাহর বিধানের ওপর নির্ভরকারী হাজার আলেমের বিরুদ্ধে জিহাদ শব্দ ব্যবহার করে নাটক করছিস।
তুমি যে অংশে লিখেছ মঞ্চ থেকে নারী কমিশনকে বেশ্যার কমিশন বলা, নারী অধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে অশ্লীল স্লোগান সেটা খুব বাস্তব আর ভয়ংকর। ধর্মের নামে ভাষার এই অশ্লীলতা সত্যিই নারীদের জন্য এক ধরনের ঘোষণা যুদ্ধ।
শুধু হেফাজতকে দোষ দিলে হবে না; নারী কমিশনের রিপোর্টেও অনেক বাড়াবাড়ি ছিল। ইনহেরিটেন্স, ফ্যামিলি ল, মারিতাল রেপ এসবের প্রস্তাব দেওয়ার আগে সাধারণ মুসলিম সমাজের সাথে কথা বলেছে কি? তুমি একতরফাভাবে কমিশনের পক্ষে দাঁড়িয়েছ।
যারা নারী কমিশনকে পতিতা কমিশন বলছে, তারা আসলে পুরুষতন্ত্রের প্রধান দালাল এই বক্তব্যের সাথে একমত। নিজেরা নারীর নাম ব্যবহার করে রাজনীতি করে, কিন্তু সত্যিকারের ক্ষমতা বিতরণে নারীর উপস্থিতি দেখলেই ক্ষেপে যায়।
তোমার লেখায় আলেমদের জন্য কোনো সম্মান নেই সবাই দাড়িওয়ালা জিহাদি , ফতোয়া ব্যবসায়ী , নারীর শত্রু । লক্ষ করেছো, তুমি নিজেই কতটা ঘৃণার ভাষা ব্যবহার করছো, যেটা নিয়ে তুমি ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছো?
তুমি যেভাবে নারী কমিশনের প্রস্তাবগুলো ইকুয়াল ইনহেরিটেন্স, ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড, পার্লামেন্টে ৫০% নারী আসন সহজ ভাষায় ভেঙে লিখেছ, এতে বোঝা যায় কেন হেফাজত এত আতঙ্কে। এ প্রস্তাবগুলো সত্যিই পিতৃতন্ত্রের গায়ে হাত রাখে।
হেফাজতের শাপলা চত্বরের শহীদদের কথাও তো আছে কতজনকে হত্যা করা হল, কতজন নিখোঁজ এসব বিষয়ে তোর কলমে এত কষ্ট দেখি না, যতটা নারী কমিশনের জন্য ফিল করিস। এটা প্রমাণ করে তোর সিলেক্টিভ মানবতাবোধ।
তুমি ঠিকই বলেছ, হেফাজতের ভাষণে জেন্ডার সমতা , থার্ড জেন্ডার , ইনক্লুশন এই শব্দগুলোকে সরাসরি সমকামিতার ষড়যন্ত্র বানিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে নারী অধিকার আর LGBT অধিকার দুটোই একই খলনায়ক হিসেবে টার্গেটে চলে গেছে।
তুই হিন্দু, তোর কাছে শারিয়া কানুনের কোনো মানে নাই এই কারণে মনে হয় এত সহজে আল্লাহর ইনহেরিটেন্স লকে বদলানোর কথা লিখতে পারিস। মুসলিমদের পারসোনাল ল’তে এভাবে হস্তক্ষেপ করা পলিটিক্যাল ফ্যাসিজম, সেটাও ভাবিস না।
যেটা বেশি পোড়ায়, তুমি সেটা ভালো ধরেছ শাপলা চত্বরে একটাও নারী না, সবাই পুরুষ; তারা দাঁড়িয়ে বলছে নারীদের জন্য কোন আইন হবে, কোনটা হবে না। একজন নারীও যদি মাইকে না থাকে, সেই মঞ্চ নারীর প্রতিনিধিত্বের দাবি করতে পারে না।
তুমি সব সময়ই ইসলামের সাথে নারীবিদ্বেষ শব্দটা জুড়ে দাও। অথচ অনেক নারীবাদীও পরিবার, বিয়ে, মাতৃত্ব এসবকে একধরনের বোঝা বলে; সাধারণ মুসলিম নারী এ ধরনের ফেমিনিজমও রিজেক্ট করে। সেই জায়গাটাও দেখতে হবে।
তুমি যে লাইনটা লিখেছ শাপলা চত্বরের পুরুষরা নারীর শরীর নিয়ে আইন করতে চায়, কিন্তু মাইক্রোফোনে একটাও নারী নেই এটা খুবই শক্তিশালী। আমাদের সব ধর্মীয় পলিটিক্সের মঞ্চই আসলে অল মেল ক্লাব।
আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে কথা বলে তুই মনে করিস তুই নারীর অধিকার রক্ষা করছিস। আসল সত্য হলো, তুই নারীকে আল্লাহর দাসী থেকে মানুষের দাসী বানাতে চাইছিস, পশ্চিমা মডেলের অনুসারী বানাতে চাইছিস। তোর জন্য জাহান্নামের আজাবই যথেষ্ট।
ভালো হয়েছে যে তুমি পুরোনো এইচআরডব্লিউ ও সুপ্রিম কোর্টের ফতোয়া বিরোধী রায়ের প্রসঙ্গ এনেছ যেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, গ্রাম্য ফতোয়াকে অস্ত্র বানিয়ে নারীর ওপর সহিংসতা চালানো যাবে না। হেফাজতদের এখনকার ভাষা সেই পুরোনো সহিংসতার নতুন সংস্করণ।
নারী কমিশনের রিপোর্টেও কিছু জিনিস বিতর্কিত, যেমন একদম হঠাৎ করে সব পারসোনাল ল’ বাতিলের প্রস্তাব। তুমি সেটা নিয়ে কোনো ক্রিটিক করনি। নীতির দিক থেকে তুমি কমিশনের মুখপাত্র, এডভোকেট না হয়ে বিশ্লেষক হলে ভালো লাগত।
তুমি খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছ, শাপলা চত্বরের হুঙ্কারের আওতায় শুধু নারীর ইনহেরিটেন্স না Marital rape criminalise, সেক্স ওয়ার্কারদের অধিকার, সিঙ্গল মাদারের স্বীকৃতি সবকিছু চলে গেছে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র ট্যাগের নিচে।
তুই হিন্দু নাস্তিক বলে হয়ত বুঝবি না, কিন্তু আমাদের জন্য কোরআনের আইন পালন করা ঈমানের অংশ। তুই যখন সেই আইনের পরিবর্তন দাবি করিস, তখন আসলে তুই সরাসরি আল্লাহ’র সাথেই যুদ্ধ ঘোষণা করছিস।
নারীর কমিশনের ওপর হুঙ্কার মানে আসলে প্রতিটা নারীকে বার্তা তোমাদের ভবিষ্যৎও আমাদের মুঠোয় এই কথাটা ইনডাইরেক্ট হলেও খুব সত্যি। আইন বদলাতে না পারলেও ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখাই এখনকার কৌশল।
তুমি হেফাজতকে যতই গালি দাও, সাধারণ মানুষ কিন্তু অনেক বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত ইনহেরিটেন্স, পরিবার, পর্দা। তুমি যদি এই গ্যাপটা বোঝার চেষ্টা না করে শুধু ইসলামিস্ট = শত্রু বানিয়ে লেখ, তাহলে ডায়ালগের রাস্তা বন্ধই থাকবে।
তবু, শাপলা চত্বরের ভাষণে যে অশ্লীলতা, অপবাদ, নারী বিদ্বেষ ছিল, সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তুমি অন্তত এই কথাটা জোরে বলেছ ধর্মের নামে কেউ নারী কমিশনকে বেশ্যার কমিশন বললে সেটা আল্লাহতালার আইন রক্ষা না, নিজের বিকৃত নফস রক্ষা।
আল্লাহর কিতাবের বিরুদ্ধে কলম চালিয়ে তুই মনে করিস তুই মাইন্ডফুল ফেমিনিস্ট ! আসলে তুই নিজের বিখ্যাত হওয়ার জন্য ধর্ম, নারী আর কুইয়ার এই তিনটা ইস্যুকেই ব্যবহার করছিস। কিয়ামতের দিন এই অনলাইন গুণাহের স্ক্রিনশট থেকেই তোর হিসাব হবে।