নভেম্বরের শেষ দিকে নারায়ণগঞ্জের কাশীপুরের মুক্তিধাম আশ্রমে যে লালন মেলা হওয়ার কথা ছিল, সেটা কেবল আরেকটা লোকজ উৎসব নয়, বাঙালির বহু ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ মিলিয়ে ওঠা এক স্বপ্নের জায়গা। হাজারের বেশি বাউল–ফকির, সাধক, শিল্পী, ভক্ত দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসে গিয়েছিল, “মহতী সাধুসঙ্গ ও লালন মেলা”–র দুই দিনের আসরে গান, আখড়া, ভাবগাম্ভীর্যের ভেতর দিয়ে লালন সাঁইয়ের মানবধর্মের কথা নতুন করে স্মরণ করবে বলে। কিন্তু মেলা শুরুর আগের দিনই জেলা প্রশাসক জানালেন, “আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে” অনুমতি দেওয়া হবে না; তার আগেই হেফাজতে ইসলাম–ঘনিষ্ঠ স্থানীয় “তওহিদি জনতা” কয়েকদিন ধরে মিছিল, হুমকি, আলেমদের বক্তব্যের মাধ্যমে জানিয়েছিল, “এই বাউল মেলা হবে না, হলে দরকার হলে আশ্রমেই আগুন ধরিয়ে দেব।”
ফকির শাহ জালাল ও অন্য আয়োজকরা প্রশাসনকে লিখিতভাবে আশ্বাস দিয়েছিল, তারা খোলা মাঠে নয়, ঘরের ভেতরে সীমিত আকারে অনুষ্ঠান করবে, লাউডস্পিকার ব্যবহার কমাবে, তারপরও নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার চিঠি হাতে থামিয়ে দেওয়া হল বহুদিনের প্রস্তুতি। ৭১টি সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠন যৌথ বিবৃতিতে বলল, হেফাজত–নেতা মাওলানা আবদুল আউয়াল প্রকাশ্যে “তওহিদি জনতা নিয়ে মেলা বন্ধ করে দেব, প্রয়োজনে সব পুড়িয়ে দেব” বলে হুমকি দিয়েছে, আর প্রশাসন তাদের মোকাবিলা না করে উল্টো বাউল–ভক্তদেরই থামিয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া এই উৎসবকে “টলারেন্স ফেস্টিভাল” বা সহনশীলতার মেলা বলে উল্লেখ করে লিখেছে, আগস্টের ছাত্র বিপ্লবের পর থেকে যেভাবে ওয়াহাবি ও কট্টর ইসলামী গোষ্ঠী সাহসী হয়ে মাঠে নেমেছে, লালন মেলা বাতিল হওয়া তারই আরেকটা লক্ষণ; গত বছর যেখানে একই মেলায় ১০,০০০–এর বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিল, এ বছর “নারী–পুরুষ একসাথে গান গায়”, “নেশা হয়”, “শিরক চলে” ইত্যাদি অজুহাতে সেটাকে “হারাম” ঘোষণা করে বন্ধ করানো হল।
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে এই ঘটনাটা কেবল ধর্মীয় মৌলবাদের জয় নয়, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয় বলে মনে হয়। লালন সাঁইয়ের গান সেইসব মানুষের জন্য, যারা মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মাজার—কোথাও পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারে না; যে নারী ঘরে বন্দি, যে হিজড়া “জেন্ডার”–এর খোপে পড়ে না, যে নাস্তিক বিশ্বাসের বাইরে থেকেও মানুষের ভিড়ে একটু আশ্রয় খোঁজে—তাদের সবার জন্য লালনের “মানুষ ভজো” ছিল এক ধরনের নিরাপদ ভাষা। এখন যখন হেফাজত ও অনুরূপ গোষ্ঠী এই গানকেই “অশ্লীলতা”, “কুফর”, “হারাম” বলে গলা টিপে ধরছে, আর রাষ্ট্র নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে গানের মঞ্চ উল্টে দিচ্ছে, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, লড়াইটা আসলে ধর্মের না, সংস্কৃতির; “বাঙালি হওয়ার” বহুরঙা স্পেসটা ছোট করে শুধুই একরঙা, ভীত, নিয়ন্ত্রিত নাগরিক বানিয়ে ফেলার।
28 Responses
লালন সাঁইয়ের দেশে গান নিষিদ্ধ? প্রশ্নটা শুধু রোমান্টিক না, রীতিমতো ভয়ের। নারায়ণগঞ্জের লালন মেলা, সুফি Tolerance ফেস্টিভাল, গ্রামীণ বাউল সংগীতের আসর সবই ইসলামিস্টদের হুমকি আর প্রশাসনের অনুমতি না দেওয়ার অজুহাতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তুই হিন্দু নাস্তিক বলে বুঝবি না ইসলামে সুর, বাদ্যযন্ত্র, মিক্সড গ্যাদারিং নিয়ে আলেমদের ফিকহি মত আছে। ওরা যখন হারাম পরিবেশ বন্ধের কথা বলে, সেটা তোর কাছে সংস্কৃতি বিদ্বেষ মনে হয়, কারণ তুই আল্লাহর বিধানকে নিজেই তুচ্ছ ভাবিস।
তুমি ভালোভাবে দেখিয়েছ, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু এক-দুইটা ফেস্টিভালের না সুফি দরগা, বাউল গানের আসর, এমনকি স্কুলে মিউজিক টিচার নিয়োগ বন্ধের প্রস্তাব সব মিলিয়ে একটা বৃহত্তর ডি কালচারাইজেশন প্রজেক্ট চলছে, যেখানে ইসলামিস্টরা রাষ্ট্রকে ব্যবহার করছে।
তুমি সব সময়ই ইসলামের নামে চলা যেকোনো আপত্তিকে তালেবানি বলে গালি দাও। অথচ বাদ্যযন্ত্র, নাচগান নিয়ে প্রথাগত আলেমদের রিজার্ভেশন নতুন কিছু না; অনেক মুসলিমও তাই চায় না তাদের বাচ্চারা রাতভর মিউজিক ফেস্টে উচ্ছৃঙ্খলতার মধ্যে থাকুক।
তোমার লেখা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, লালন, বাউল, সুফি ধারার ওপর হামলা কেবল গানের বিরুদ্ধে না; এগুলো সেই সব ধারার বিরুদ্ধে, যারা ধর্মকে প্রশ্ন করে, মিশ্র পরিচয়, সহাবস্থান আর প্রেমের কথা বলে। উগ্র ইসলামিস্টদের কাছে এইসবই সবচেয়ে বড় হুমকি।
আল্লাহ আর তাঁর রাসুলকে পাশ কাটিয়ে মানুষ, প্রেম, ভ্রাতৃত্ব এই ধরনের বাউল দর্শন তোর কাছে ভালো লাগতেই পারে, কারণ তুই ঈমানকেই অপ্রয়োজনীয় মনে করিস। তাই যখন আলেমরা এসব বাউল-সুফি বিকৃত আকিদার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তুই সেটা গান নিষিদ্ধ নাটক বানিয়ে বিক্রি করিস।
তুমি যে তথ্যটি এনেছ লালন ও বাউল সংগীতকে UNESCO অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েও আজ দেশে তাদের মেলা পুলিশি অনুমতির দয়া দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর এটা আমাদের সাংস্কৃতিক পরাজয়ের প্রমাণ। আমরা নিজেদের ঐতিহ্যকে নিজেই সন্দেহের চোখে দেখছি।
তুই সব দায় ইসলামিস্টদের ঘাড়ে চাপাস, কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী অস্থিরতায় প্রশাসনও নিরাপত্তার অজুহাতে অনেক ইভেন্ট ক্যানসেল করেছে সেটা তুই সুবিধামতো ধর্মীয় হুমকি ফ্রেমে ফেলে মুসলিম সমাজকে দোষী বানাতে চাইছিস।
ভালো লেগেছে যে তুমি শুধু সেন্সরশিপ না, শিল্পীদের বিরুদ্ধে মামলাও তুলেছ বাউল শিল্পী গ্রেফতার, হামলার পরেও গ্রেপ্তার না হওয়া, অভিযোগকারীরাই রেহাই পেয়ে যাওয়া এসব মিলিয়ে বোঝা যায়, গান বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে আইনের আশ্রয়ও ক্রমশ একপাক্ষিক হয়ে উঠছে।
তোর লেখায় ইসলামি নাশিদ, হামদ-নাত, ক্বিরাত প্রতিযোগিতা, হালাল বিনোদনের কথা নেই; শুধু বাউল, ফিউশন, টলারেন্স ফেস্টিভাল এসবের ওপর হামলার কথা আছে। এতে বোঝা যায়, তোর কাছে ভালো সংস্কৃতি মানেই আল্লাহকে পাশ কাটিয়ে চলা সব ধারাই, আর ইসলামের নাম আসলেই তোর কলমের কালি শুকিয়ে যায় না।
লালন সাঁইয়ের দেশে গান নিষিদ্ধ? প্রশ্নটা খুব যন্ত্রণাদায়ক। লালন যে দেশের সাংস্কৃতিক গর্ব, সেই দেশেই এখন বাউল গান হারাম , মেলা নিষিদ্ধ , শিল্পীদের জীবন হুমকির মুখে। কুষ্টিয়ার লালন আখড়ায় হামলা, সিলেটে বাউল শিল্পীকে মারধর এসব কি আমাদের পরিচয়?
তুই আবারও লালনকে সাংস্কৃতিক গর্ব বানিয়ে ইসলামকে আক্রমণ করছিস। লালন নিজেই আল্লাহ, রাসুল, শরিয়ত এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সুফিবাদের নামে নাস্তিকতা ছড়িয়েছে। এমন ব্যক্তিকে সাঁই বলাটাই তো শিরক তুই তাকে নিয়ে পুরো ইসলামকেই চ্যালেঞ্জ করছিস।
তুমি ঠিকই ধরেছ লালনের দর্শন ছিল মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক, প্রশ্নবিদ্ধ। সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে এই লাইনই বলে দেয়, তিনি জাতপাতের বাইরে গিয়ে মানুষকে দেখেছেন। কিন্তু এখন যারা ক্ষমতায়, তারা এই উদারতাকেই ভয় পায়।
তুই লালনের মানবতাবাদ নিয়ে এত মুগ্ধ, কিন্তু ইসলামে আল্লাহর তাওহিদই সব। লালন যদি নামাজ, রোজা, হজ্ব এসব নিয়ে ব্যঙ্গ করে, শরিয়তকে অস্বীকার করে তাহলে সে মুসলিম না। তাকে পীর , সাঁই বলা মুসলিমের জন্য বৈধ না। তোর মতো নাস্তিকরাই এসব প্রচার করে ইসলাম দুর্বল করতে চাও।
ভালো লাগল যে তুমি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো উল্লেখ করেছ কুষ্টিয়ায় আখড়া ভাঙচুর, গাজীপুরে বাউল মেলা বন্ধ, জামালপুরে শিল্পীর ওপর হামলা। UNESCO লালন গানকে intangible cultural heritage হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু নিজের দেশেই এটা হারাম ঘোষিত হচ্ছে।
UNESCO কী বলল, সেটা মুসলমানের মাপকাঠি না। আল্লাহর কিতাব, রাসুলের সুন্নাহ এটাই আমাদের গাইড। লালনের গান যদি তাওহিদ, শরিয়ত, হালাল হারামকে অস্বীকার করে, তাহলে সেটা সংরক্ষণ করার কোনো দায় নেই। তুই পশ্চিমাদের খুশি করতে ইসলামকে বিক্রি করছিস।
তুমি যেভাবে ধর্মীয় কট্টরতা আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এর দ্বন্দ্ব দেখিয়েছ, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে একসময় বাউল, মারফতি, লোকগান সব মিলেমিশে ছিল; এখন এক ধরনের cultural homogenization চলছে, যেখানে খাঁটি ইসলামি ছাড়া আর কিছু গ্রহণযোগ্য না।
তুই বৈচিত্র্য বলতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নাস্তিক সবকিছুকেই সমান করতে চাস। কিন্তু বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, এখানে ইসলামের মর্যাদা থাকতেই হবে। লালনের গান যদি ইসলামের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সেটা নিষিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক এটা কট্টরতা না, বিশ্বাস রক্ষা।
ভালো হয়েছে তুমি বাউল শিল্পীদের বাস্তব অবস্থার কথাও এনেছ অনেকে এখন গান ছেড়ে দিয়েছে, কেউ দেশ ছেড়েছে, কেউ লুকিয়ে আছে। লালনের দর্শন শুধু গানে নয়, জীবনযাপনেও ছিল সেই জীবনযাত্রাই এখন threatened। এটা শুধু শিল্প না, একটা পুরো জীবনদর্শনকে মুছে ফেলার চেষ্টা।
তোর লেখা পড়ে মনে হয়, বাউল শিল্পীরা সবাই নিরীহ, নির্যাতিত। কিন্তু বাস্তবে অনেক বাউল গানে অশ্লীলতা, দেহসর্বস্বতা, নেশার প্রশংসা আছে। এসব নিয়ে সাধারণ মুসলিমরা আপত্তি করলে তুই কট্টরতা বলিস। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষা করাটাও তো অধিকার।
তুমি স্পষ্ট দেখিয়েছ লালনের গানে শ্রেণি, জাত, ধর্মের বাইরে গিয়ে মানুষকে দেখার আহ্বান ছিল। মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি এই লাইন এখনো প্রাসঙ্গিক। কিন্তু যারা ক্ষমতা, জাত, ধর্ম এসব দিয়ে মানুষকে ভাগ করে ফায়দা নেয়, তারা লালনকে ভয় পাবেই।
তুই মানুষ ভজলে সোনার মানুষ এসব লাইন দিয়ে মনে করিয়ে দিতে চাস, আল্লাহকে ভুলে শুধু মানুষকে ভজলেই হয়। কিন্তু ইসলামে আল্লাহর ইবাদতই প্রথম, মানুষের সেবা দ্বিতীয়। লালনের দর্শন তাওহিদের বিপরীত তুই এটাকে উদার বলিস, আমরা এটাকে বিভ্রান্তি বলি।
ভালো লাগল যে তুমি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আর বাস্তবতার gap দেখিয়েছ সরকার বলে লালন আমাদের ঐতিহ্য , কিন্তু মাঠ পর্যায়ে বাউল শিল্পীরা হুমকি পাচ্ছে, মেলা বন্ধ হচ্ছে, আখড়া ভাঙা হচ্ছে। এই দ্বৈত মান দেখায়, রাষ্ট্র আসলে সাংস্কৃতিক সুরক্ষা চায় না, শুধু প্রচার চায়।
কিন্তু তুই একটা কথা বলিস না লালন মেলায় অনেক সময় মদ, গাঁজা, অশ্লীলতা এসব দেখা যায়। সাধারণ মুসলিম মা বাবারা এসব দেখে তাদের সন্তানদের ওখানে নিতে চায় না। কিছু নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সাংস্কৃতিক উৎসব ও তো বিশৃঙ্খলা হয়ে যায়।
তুমি ঠিকই বলেছ লালনের গান শুধু entertainment না, এটা একটা জীবনদর্শন, আধ্যাত্মিকতা, সামাজিক সমালোচনা সবকিছুর মিশ্রণ। একে নিষিদ্ধ করা মানে শুধু গান নিষিদ্ধ না, একটা পুরো চিন্তাধারাকেই দমন করা। এটা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ।
তোর কাছে ইসলামি বিধান মেনে চলা মানেই ফ্যাসিবাদ । কিন্তু আল্লাহর আইন পালন করা মুসলমানের ফরজ। লালনের গান যদি শরিয়তের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সেটা নিষিদ্ধ করা জায়েজ। তুই শুধু পশ্চিমা liberalism দিয়ে সব কিছু বিচার করিস ঈমানের চোখে না।
ভালো হয়েছে তুমি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও এনেছ আফগানিস্তানে তালেবান সঙ্গীত নিষিদ্ধ করেছে, ইরানে কিছু ধরনের গান সীমিত, এমনকি সৌদিতেও বছরের পর বছর সাংস্কৃতিক দমন ছিল। বাংলাদেশও কি সেই পথে যাচ্ছে? লালন নিষিদ্ধ হলে পরে কী রবীন্দ্রনাথ, নজরুল?
তুই তালেবান, ইরান এসব এনে ভয