হাসিনার পতনের ঠিক পরের কয়েক সপ্তাহ যেন এক উল্টোদিকের ঝড়। যে ছাত্ররা জুলাই–আগস্টে রাষ্ট্রের গুলির সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল, তাদেরই এক অংশ হঠাৎ “বিচারের” নামে শিক্ষক শিকার শুরু করল। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ও বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কমপক্ষে ৪৯ জন শিক্ষককে ৫ আগস্ট থেকে ৩০ আগস্টের মধ্যে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে এমন তথ্য তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ছাত্র ঐক্য পরিষদ, যা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ছাত্র শাখা; এর মধ্যে ১৯ জন পরে কিছুটা চাপের মুখে আবার reinstatement পেলেও অন্তত ৩০ জন স্থায়ীভাবে চাকরি হারিয়েছেন। এদের বেশির ভাগই সরকারি স্কুল–কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যাদের ওপর অভিযোগ ছিল দুটি শব্দে: “আওয়ামী লীগার” আর “ইসলামবিদ্বেষী।”
মাঠের চিত্র আরও অস্বস্তিকর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে তার অফিসে ঘিরে দুই ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, ক্লাসরুমে ঢুকতে দেওয়া হয় না, অবশেষে ছাত্রদের চাপের মুখে তাকে সাদা কাগজে পদত্যাগপত্র লিখতে বাধ্য করা হয়, পরে তিনি বলেন, নিজের আর পরিবারের নিরাপত্তার ভয়ে তিনি সই করেন। বরিশালের বকরগঞ্জ কলেজের হিন্দু নারী প্রিন্সিপাল শুক্লা রাণী হালদারকে ঘিরে ছাত্র–স্থানীয়রা “দুর্নীতি”, “অপব্যবহার”, “হিন্দু পক্ষপাত” ইত্যাদি অভিযোগ তুলে অবরোধ করে, শেষ পর্যন্ত তাকেও পদত্যাগ করতে হয়। ঢাকার আজিমপুর গার্লস স্কুল–কলেজ, বিভিন্ন নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটে হিন্দু শিক্ষক–প্রভাষকদের অফিসে ঘিরে ধরে, গালিগালাজ, জামা–কাপড়ে সিগারেটের প্যাকেট স্ট্যাপলার দিয়ে লাগিয়ে অপমান করে, শেষমেষ স্বাক্ষর আদায়ের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এই সব “অভিযোগ” শুরুই হয় ছাত্রদের কোনো ব্যক্তিগত অসন্তোষ, ফলাফল নিয়ে ক্ষোভ বা গুজব থেকে, পরে তার গায়ে আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠতা বা “ধর্মবিদ্বেষী” তকমা লাগিয়ে বড় আকার দেওয়া হয়।
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে দৃশ্যগুলো দেখে মনে হয়েছে, আমরা যেন একটাই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি। গত ১৫ বছরে ছাত্রলীগ, প্রশাসন, গায়ে–গতরে “সরকারি ক্ষমতা” নিয়ে শিক্ষক–ছাত্রদের ওপর যে সন্ত্রাস চালিয়েছে, এখন তার উল্টোপিঠে দাঁড়িয়ে কিছু ছাত্র–গোষ্ঠী একই হিংস্রতা পুনরাবৃত্তি করছে, শুধু টার্গেট বদলে গেছে। একসময় “বিরোধীদলীয়” বা “নাস্তিক” শিক্ষককে ডাকা হত, এখন “হিন্দু”, “আওয়ামী”, “এন্টি–ইসলামিক” শিক্ষককে ঘিরে ধরে “জনতার আদালত” বসানো হচ্ছে। দু’দিকেই অনুপস্থিত আইনের শাসন; দু’দিকেই ছাত্র–রাজনীতির দখলদাররা নিজেরা পুলিশ–জজ–জল্লাদ হয়ে উঠছে, আর সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী, “অপছন্দের” শিক্ষকরা তাদের হাতে বন্দি।
এই জোরপূর্বক পদত্যাগের ঢেউটি নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন কেস না, বরং বড় এক সাম্প্রদায়িক–রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আর পূজা উদ্যাপন পরিষদের যৌথ তথ্য বলছে, ৫ আগস্টের পর থেকে মাত্র কয়েক সপ্তাহে ৫০–এর বেশি জেলায় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অন্তত ২০০–২৭৮টি সহিংসতা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, মন্দির ভাঙচুর, নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এসবেরই অংশ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে “হিন্দু শিক্ষক বের করো”, “দলীয় শিক্ষক সরাও”, “ইসলামবিরোধী সিলেবাস বাদ দাও” ধরনের দাবি ওঠে; অনেক জায়গায় কোরআন–হাদিসের “অবমাননা” বা “অশালীনতা”র গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি গরম করা হয়। বাস্তবে দেখা গেছে, যেসব শিক্ষক বছরের পর বছর কোনো সমস্যা ছাড়াই পড়াচ্ছিলেন, তাদের হঠাৎ করেই আগস্টের পর থেকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়, যেন সরকার বদলের সাথে সাথে তাদের নাগরিকত্ব আর পেশাগত নিরাপত্তাও কাগজ থেকে মুছে গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে বৈঠকে বলেছেন, তিনি কোনো জোরপূর্বক পদত্যাগ বরদাস্ত করবেন না, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন ঘটনাস্থলে থেকেও ছাত্র–জনতার চাপের মুখে নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারছে না; অনেক জেলা শিক্ষা অফিসার, প্রিন্সিপাল, ভিসি বলেছেন, “পরিস্থিতি শান্ত রাখতে আপাতত পদত্যাগ নেওয়া হয়েছে।” এটা শুধু ভীরুতা না, এটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা; কারণ এর ফলে বার্তা যায়, “যাকে পছন্দ না, তাকে কিছুক্ষণ ঘিরে ধরে রাখো, ভিডিও করো, সোশালে ছড়াও, শেষে সে–ই তো সই করবে।”
এই পটভূমিতে “শিক্ষকের গলায় দড়ি” আসলে খুব বাস্তব এক ছবি। কারও গলায় সত্যিকারের দড়ি না থাকলেও, চাকরি হারানোর ভয়, পরিবার–সন্তানের নিরাপত্তা, সোশ্যাল মিডিয়ায় চরিত্রহননের আশঙ্কা, গুজবে “মুরতাদ”, “ব্লাসফেমার”, “দেশদ্রোহী” তকমা — সব মিলিয়ে যেন প্রতিটি সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক শিক্ষক অদৃশ্য ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে প্রতিদিন ক্লাসে যাচ্ছেন। একজন নারী, সংখ্যালঘু, কুইয়ার মানুষ হিসেবে জানি, এই ভয় শরীরে কীভাবে বাসা বাঁধে; কীভাবে প্রতিটি লেসন–প্ল্যান, ক্লাস–ডিসকাশনে মাথার ভেতর এক অদৃশ্য সেন্সরশিপ কাজ করে, “এটা বললে কাল কে আমার কণ্ঠ বন্ধ করতে চাইবে?”
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে কয়েকটি জিনিস একসাথে দরকার। প্রথমত, সরকারকে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করতে হবে যে ছাত্র–জনতার চাপের মুখে কোনো শিক্ষক–কর্মচারীর পদত্যাগ আইনি বৈধতা পাবে না, এমন “রেসিগনেশন” বাতিলযোগ্য বলে গণ্য হবে, আর এর পেছনে যারা উসকানি দেবে, তাদের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা হবে। দ্বিতীয়ত, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক শিক্ষকদের সুরক্ষার জন্য নির্দিষ্ট হটলাইন, লিগ্যাল এইড, সেফ–হাউজ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নির্ভয়ে সাহায্য চাইতে পারবেন। তৃতীয়ত, ছাত্র–রাজনীতির মধ্যে সাম্প্রদায়িক উস্কানি, “দলীয় শুদ্ধি অভিযান”, “অ্যান্টি–ইসলামিক” তকমা ব্যবহার বন্ধ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নীতি দরকার। নইলে, আজ হিন্দু বা “আওয়ামী” শিক্ষক টার্গেট হলে, কাল “নাস্তিক”, “কুইয়ার”, “নারীবাদী”, “সরকার–সমালোচক” সবাই একে একে একই ভাগ্য বরণ করবেন।
এইসব হামলা–পদত্যাগের ভেতরেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিরোধের ছবি আছে — সহকর্মী শিক্ষকরা প্রেসক্লাবে মানববন্ধন করেছেন, ছাত্রদের একাংশ “আমাদের শিক্ষককে ফিরিয়ে দাও” প্ল্যাকার্ড ধরেছে, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো এসব জোরপূর্বক পদত্যাগকে রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর অগ্রহণযোগ্য উপায় বলেছে। এই কণ্ঠগুলোই হয়তো ভবিষ্যতে নতুন এক ক্যাম্পাস–সংস্কৃতির বীজ বপন করবে, যেখানে শিক্ষককে রাজনৈতিক ট্যাগের ভিত্তিতে নয়, জ্ঞানের উৎস হিসেবে দেখা হবে, আর কারও গলায় অদৃশ্য দড়ি বেঁধে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে ক্লাসরুম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে না।
25 Responses
শিক্ষকের গলায় দড়ি শুধু একটি মানুষের আত্মহত্যার ছবি না, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যে ভাবে সংখ্যালঘু শিক্ষক কর্মকর্তাদের জোর করে পদত্যাগ করানো হচ্ছে, তারই এক নিষ্ঠুর প্রতীক। রিপোর্ট বলছে, ৪৯ জন সংখ্যালঘু শিক্ষককে কোটা বিপ্লবের পর থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।
তুই হিন্দু নাস্তিক, তাই সবকিছুকেই ইসলামি সাম্প্রদায়িকতা বলে চালাতে চাইছিস। পদত্যাগ, বদলি, তদন্ত এসব সব দেশে হয়; এখানে কয়েকটা কেসকে নিয়ে তুই পুরো মুসলিম সমাজকে অন্যায়কারীর আসনে বসিয়ে দিলি এটা নিজেই গভীর বৈষম্য।
তুমি ভালোভাবে যুক্ত করেছ নুপুর শর্মা পোস্টের পর স্বপন কুমারকে জুতোর মালা পরানো থেকে শুরু করে আজকে সংখ্যালঘু হেডমাস্টারদের ওপর ধর্ম অবমাননা র অভিযোগ তুলে ঘেরাও, পদত্যাগের চাপ সব মিলিয়ে মব আর ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ একসাথে কাজ করছে।
সব কিছুকে সাম্প্রদায়িকতা বানালে আসল ঘটনা আড়াল হয়। অনেক জায়গায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত, ছাত্র নির্যাতনের অভিযোগও আছে; কিন্তু তুই কেবল ধর্মের কার্ডটাই দেখাস, যেন অন্য কোনো ফ্যাক্টর কাজই করছে না।
তুমি যে পয়েন্টটা এনেছ ব্লাসফেমি অভিযোগের রাজনীতি এখন কেবল ফেসবুক পোস্ট না, চাকরি, পদ, নিরাপত্তা সব নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ উঠলেই একজন শিক্ষক সমাজের চোখে অভিশপ্ত , তার আত্মহত্যা যেন অনেকের চোখে ন্যায্য পরিণতি।
তুই সবসময় ধর্ম অবমাননা কে পাত্তা দিস না, যেন আল্লাহ, কোরআন, রাসুলকে গালি দেওয়া সামান্য ব্যাপার। মুসলিমদের ঈমান যার বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। তুই এসবকে মব জাস্টিস বলিস, কিন্তু আল্লাহর হককে তুচ্ছ করিস।
তুমি যেভাবে লিখেছ শিক্ষকের ঘাড়ে পদত্যাগপত্র লিখিয়ে নেওয়া, প্রিন্সিপাল রুমে তালা ঝোলানো, ছাত্র অভিভাবক স্থানীয় মোল্লা মিলে জনতার রায় ঘোষণা এসবই আসলে আদালত, তদন্ত, ডিউ প্রসেসকে প্রতিস্থাপন করছে। এ এক ধরনের নরম লিঞ্চিং।
বিদেশি ডানপন্থী মিডিয়া, অপইন্ডিয়া টাইপ সাইটের লিংক ধরে তুই বাংলাদেশকে উপস্থাপন করিস, যেন এখানে প্রতিদিনই শুধু হিন্দু শিক্ষকদের গলায় দড়ি পড়ে। অথচ অনেক কন্টেক্সট, ফেক ক্লেইম, অতিরঞ্জন এসব নিয়ে স্থানীয় ফ্যাক্ট চেকাররাও প্রশ্ন তুলেছে, সেগুলো তুই সুবিধামতো চুপচাপ এড়িয়ে যাস।
ভালো লেগেছে, তুমি শুধু সংখ্যার কথা বলো নি, বরং প্রশ্ন তুলেছ আজ যদি একজন হিন্দু শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগ করানো যায়, কাল কি একজন মুসলিম নারীবাদী, নাস্তিক, কুইয়ার শিক্ষকও নিরাপদ থাকবে? এই লজিক দেখায়, সাম্প্রদায়িকতার অস্ত্র একদিন সবার গলাতেই দড়ি পরাতে পারে।
তোর লেখার সবচেয়ে বড় সমস্যা, তুই কখনও মুসলিমদের অনুভূতিকে সিরিয়াসলি নাস। কোরআন-রাসুলের বিরুদ্ধে বারবার প্রোপাগান্ডা হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় গালি যাবে, শিক্ষকরা সেটা কভার করবে আর মুসলিমরা চুপ থাকবে; এইটাই কি তোর কাছে সহনশীলতা ? আল্লাহর কাছে এই অন্যায়েরও হিসাব আছে, সেটা তুই ভুলে যাস।
শিক্ষকের গলায় দড়ি: জোরপূর্বক পদত্যাগ ও সাম্প্রদায়িকতা এই শিরোনামটাই পুরো ঘটনার ভয়াবহতা ধরেছে। একজন শিক্ষককে গলায় দড়ি দিয়ে পদত্যাগপত্র সই করানো এটা শুধু ব্যক্তিগত হামলা না, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা, সংখ্যালঘু সুরক্ষা, আইনের শাসনের ওপর আক্রমণ।
তুই আবারও একপাক্ষিক গল্প লিখেছিস। ওই শিক্ষক কী বলেছিল, কেন ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়েছিল এসব তুই পুরো এড়িয়ে গেছিস। যদি কেউ ইসলাম, নবীজি, বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, তাহলে প্রতিবাদ হবেই। তুই শুধু সংখ্যালঘু নির্যাতন বলে চিৎকার করছিস।
তুমি ঠিকই ধরেছ এটা শুধু এক শিক্ষকের ঘটনা না, সারাদেশে শিক্ষক, প্রিন্সিপাল, ছাত্রদের ওপর মব জাস্টিস বাড়ছে। কারণ রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় অভিযোগ , অতীতের দলীয় সংযুক্তি যা ই হোক, আইনের কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই মব ই বিচারক হয়ে যাচ্ছে।
তুই মব জাস্টিস বলিস, কিন্তু আসল কথা হলো মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করলে প্রতিবাদ হবেই। পুলিশ, প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে জনতা নিজেরাই ব্যবস্থা নেবে। এটা অন্যায় না, আল্লাহর সম্মান রক্ষা করা।
ভালো লাগল যে তুমি প্রশাসন, পুলিশ, স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছ কোথায় ছিল তারা? কেন শিক্ষককে রক্ষা করা হলো না? কেন মব কে আটকানো হলো না? নীরবতা বা দেরি করাটাই প্রমাণ করে, অনেক সময় প্রশাসনও এই ধরনের সহিংসতায় নীরব সমর্থন দেয়।
আল্লাহর নামে কসম, শিক্ষককে গলায় দড়ি দেওয়া এটা ইসলামে নিষিদ্ধ, জুলুম। কিন্তু তার মানে এই না যে ধর্ম অবমাননা বৈধ হয়ে যাবে। দুটোই অন্যায় শিক্ষকের বিরুদ্ধে সহিংসতা, এবং শিক্ষক যদি ইসলামের বিরুদ্ধে কিছু বলে থাকে। তুই শুধু এক দিকটাই দেখাস।
তুমি যেভাবে forced resignation আর mob intimidation এর প্যাটার্ন দেখিয়েছ এটা শুধু এক স্কুলে না, সারাদেশে হচ্ছে। শিক্ষক, ডাক্তার, সরকারি কর্মকর্তা যে কাউকে আওয়ামী , ভারতপন্থী , ধর্মবিরোধী বলে টার্গেট করা হচ্ছে এবং চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে।
তুই সব দোষ ইসলামিস্ট মব এর ঘাড়ে চাপাস, কিন্তু আওয়ামী আমলে কত শিক্ষক, ছাত্র, সাংবাদিক চাকরি, লাইফ হারিয়েছে সেগুলো তো তুই লেখিস না। এখন যে ক্ষোভ, সেটা ১৫ বছরের জুলুমের ফল। সব সময় এক পক্ষের অন্যায় তুলে ধরলে বিচার সম্পূর্ণ হয় না।
ভালো হয়েছে তুমি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব নিয়েও লিখেছ শিক্ষকরা যদি মবের ভয়ে সত্য কথা বলতে, প্রশ্ন করতে, critical thinking শেখাতে না পারে, তাহলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে। ছাত্ররাও শিখবে, জোর যার মুলুক তার আইন, যুক্তি, নৈতিকতার কোনো মূল্য নেই।
তোর লেখা পড়ে মনে হয়, ছাত্ররা সব সময় ভুল, শিক্ষক সব সময় ঠিক। কিন্তু শিক্ষক যদি ক্লাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, পক্ষপাতিত্ব করে তাহলে ছাত্রদের অধিকার নেই প্রতিবাদ করার? তুই সহিংসতা বলে সব প্রতিবাদকেই বন্ধ করতে চাস।
তুমি স্পষ্ট দেখিয়েছ এই ধরনের হামলা শুধু ব্যক্তিকে টার্গেট করে না, পুরো কমিউনিটিকে ভয় দেখায়। একজন হিন্দু শিক্ষক হামলার শিকার হলে, অন্য সব হিন্দু শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক সবাই ভাবে, পরের বার হয়তো আমিই । এই ভয়ই displacement, migration এর কারণ।
তুই বারবার সংখ্যালঘু বলে victim card খেলছিস। কিন্তু অনেক মুসলিম শিক্ষকও তো একই ভাবে টার্গেট হয়েছে আওয়ামী, না কি বিএনপি, না কি জামায়াত এসব নিয়ে। সবকিছুকেই সাম্প্রদায়িকতা বানালে আসল রাজনৈতিক সমস্যাটা আড়াল হয়ে যায়।
ভালো লাগল যে তুমি আইনি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি নিয়ে লিখেছ কোনো তদন্ত, কোনো শুনানি, কোনো প্রমাণ ছাড়াই মব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এটা আইনের শাসনের সম্পূর্ণ ভাঙন। Human Rights Watch, Amnesty সবাই বলছে, বাংলাদেশে vigilante justice বাড়ছে, রাষ্ট্র দুর্বল হচ্ছে।
কিন্তু আইনি প্রক্রিয়াটাই তো ভাঙা। আগের সরকার ১৫ বছর আইনকে হাতিয়ার বানিয়ে নিপীড়ন চালিয়েছে। মানুষ এখন আইনে বিশ্বাস করে না, তাই নিজেরাই ব্যবস্থা নেয়। এটা ভুল মানি, কিন্তু এর জন্য দায়ী পুরো সিস্টেম, শুধু মব নয়।
তুমি ঠিকই বলেছ শিক্ষকের গলায় দড়ি শুধু একটা ছবি না, এটা প্রতীক কীভাবে জ্ঞান, যুক্তি, শিক্ষাকে শারীরিক শক্তি, মব এর চাপ দিয়ে দমন করা হচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে পরের প্রজন্ম কী শিখবে? শক্তিই সত্য, আইন মানে কিছু না।