বাংলাদেশের ধর্মীয় মানচিত্র কাগজে–কলমে সুন্নি মুসলিম হলেও, বাস্তবের ভুবনে এই ইসলামটা শতাব্দীজুড়ে গান, গণেশের মেলা, লালনের দোলা, মাজারের শিরনি, গাজনের ঢাক আর নওয়াজের সুরে মিশে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ২০২৪–এর আগস্ট–সেপ্টেম্বর থেকে যে দৃশ্য দেখতে শুরু করলাম, সেখানে এই মিলনভূমিটাই প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল, অন্যদিকে ইসলামী উগ্র গোষ্ঠীর নতুন উত্থান, সব মিলিয়ে সারা দেশে সুফি মাজার ও দরবারের ওপর হামলার এক উদ্বেগজনক ঢেউ দেখা দিল। গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড গুড গভর্ন্যান্সের এক বিশ্লেষণ বলছে, ৪ আগস্ট ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত কমপক্ষে ৪০ থেকে ৮০টি মাজারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, হামলার ঘটনা ঘটেছে, পুলিশের জানুয়ারি ২০২৫–এর একটি রিপোর্টে ৪৪টি হামলার কথা উল্লেখ থাকলেও সুফি সংগঠনগুলো আরও বেশি সংখ্যা দাবি করছে।
এই হামলাগুলোর তালিকায় আছে সিলেটের বহুপুরাতন শাহ পরান (রহ.) মাজার, ঢাকার ধামরাইয়ের বুছাই পাগলা, ময়মনসিংহের সাইয়দ কালু শাহ, গাজীপুরের শাহ সুফি ফসিহ পাগলা, নোয়াখালীর ফকির চারু মিঝি শাহ, চট্টগ্রামের বড় আউলিয়া, নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগ দরবার, ঠাকুরগাঁওয়ের বিবি সখিনা, নরসিংদীর একাধিক পাগলা দরবার সহ অসংখ্য স্থানীয় আধ্যাত্মিক আস্তানা। কোথাও রাতে গিয়ে গম্বুজে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানো হয়েছে, কোথাও মাজারের মিনারে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে ভেঙে ফেলা হয়েছে, কোথাও তীর্থযাত্রীদের মাথায় লাঠি, টিনের শেড, তাঁবু, গাজন–মেলা, মাইক সব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হামলাকারীরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের “তওহিদি জনতা”, “সিরাতুল মুস্তাকিম”, “ওয়াহাবি তাওহিদি সংগঠন” ইত্যাদি নামে পরিচয় দিয়ে বলেছে, মাজার–কেন্দ্রিক গানের আসর, নৃত্য, শিরনি, মানত, মিলাদ — সবই “বিদআত” আর “শিরক”; তাই এগুলো ধ্বংস করা “ধর্মীয় কর্তব্য।”
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে এই হামলাগুলোর মধ্যে শুধু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নয়, বাঙালিত্বের মূলে আঘাত দেখতে পাই। লালন, শাহ পরান, শাহ জালাল, গাজী পীর, শাহ সূফি ফকির — এইসব মাজারের চারপাশেই গড়ে উঠেছে বাংলা গানের এক ধারাবাহিকতা, যেখানে মুসলমান–হিন্দু, নারী–পুরুষ, কৃষক–শ্রমিক, কুইয়ার–অসামঞ্জস্য সবাই নিজের মতো করে “দরবারে” গিয়ে দাঁড়াতে পারে। ওয়াহাবি–সালাফি ভাবধারার চোখে এই সবই “কুসংস্কার”, “হারাম”, “সরাসরি কুরআন–হাদিসবিরোধী”। তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ মানে, কোনো গানের মেলা থাকবে না, কোনো ধুনিয়া পাগলা থাকবে না, কোনো নারী–পুরুষ একসাথে নাচবে না, কোনো তবলচি রাতভর গাইবে না — শুধু একরঙা, বিধিনিষেধ–ভরা, নিঃসঙ্গ এক বিশ্বাসের চাদর।
শাহ পরান মাজারের সেপ্টেম্বরের সংঘর্ষটা এই দ্বন্দ্বকে খুব স্পষ্ট করে দিল। বহু শতাব্দীর পুরোনো এই দরবারে বার্ষিক ওরশে ফকির, ভক্ত, দরবেশ, সুফি অনুসারীদের ভিড় হয়; একদল মাদরাসা শিক্ষক ও স্থানীয় মুসল্লি অভিযোগ তুললেন, ওরশের নামে এখানে নাকি “নেশা, নাচ–গান, বেহায়াপনা” চলছে, তাই রাতের বেলা মাইকে ঘোষণা করে তারা এইসব বন্ধের দাবি তুললেন। অন্যদিকে মাজার কর্তৃপক্ষ আগে গান কিছুটা সীমিত করলেও, এবার আরেকদল ফকির–অনুসারী ঘোষণা দিল, সঙ্গীত বন্ধ হবে না, বরং বাড়বে। ঠিক এই টানাপোড়েনের রাতে শতাধিক লাঠিধারী মাদরাসা ছাত্র–শিক্ষক মাজার প্রাঙ্গণে হামলা করে, ফকির–দরবেশদের উপর চড়াও হয়, টেন্ট–তাঁবু–শেড–দোকান ভেঙে দেয়, কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়; পরে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়। পরে “সামাজিক ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ কমিটি” নামের এক মঞ্চ গড়ে উঠে, যারা খোলাখুলিভাবে “ঠকবাজ দরবার পোড়াও” স্লোগান দেয়।
এটি নিছক “ধর্মীয় ভ্রান্তি” না, বরং সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার ম্যাট্রিক্সের সাথে যুক্ত। ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনের পতনের পর যখন নতুন অন্তর্বর্তী সরকার ইসলামী দলগুলোর দাবির সামনে কিছুটা নরম সুর নিল, তখন ওয়াহাবি–ঘেঁষা গোষ্ঠী ধরে নিল, এখনই “মাঠ দখল” করার সেরা সময়। নানা জায়গায় তারা শুধু মাজার–মসজিদ নয়, হিন্দু মন্দির, কীর্তন–ঘর, লোকসঙ্গীত মেলা, লালন–স্মরণোৎসব এসবের ওপরও হামলা চালিয়েছে, যাতে সমগ্র বহুমাত্রিক ধর্মীয় সংস্কৃতিকে এক ঘাটে নামিয়ে আনা যায়। Sufi নেতা, তারিকত ফেডারেশন দাবি করেছে, আগস্ট ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত কমপক্ষে ৮০টির বেশি মাজারে হামলা হয়েছে; অনেক দরবার নিরাপত্তার ভয়ে নিয়মিত শনি–সোমের সঙ্গীত আসর বন্ধ করে দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছেন, মাজার–দরবারসহ সব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনার ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দেখানো হবে; কেয়ারটেকার সরকারের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙচুরের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে মাঠে থাকা সুফি অনুসারী আর সংখ্যালঘুরা এখনো ভয়ের মধ্যে আছেন; অনেকে দিন–রাতে পালা করে মাজার পাহারা দিচ্ছেন, কেউ ঠাকুরগাঁও, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, নরসিংদীতে গড়ে উঠেছে “দরবার রক্ষা কমিটি”, যারা নিজেরাই লাঠি হাতে রাত জাগছেন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটা আমাদের সবার জন্যই — বাঙালির ইসলাম কি হবে মাজার–গান–শোক–আনন্দের মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক, নরম স্রোত, নাকি সোজা লাইনের ওয়াহাবি কড়াকড়ির কপি–পেস্ট? মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন পাকিস্তানি মিলিটারি আর তাদের মিত্ররা বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আঘাত করে, গান, থিয়েটার, বাউল, রবীন্দ্রসঙ্গীতকে “অশ্লীলতা” বলে দেগে দিয়েছিল, আজকের এই মাজার–বিরোধী হামলাগুলোও সেই একই ধারার নতুন কায়ায় ফিরে আসা।
একজন নাস্তিক, উভকামী, নারীবাদী হিসেবে, আমি মাজারে গিয়ে মানত বাঁধতে না পারলেও জানি, এসব জায়গা প্রান্তিক মানুষ, নারী, কুইয়ার, অসুস্থ, নিঃসঙ্গ মানুষের জন্য কত বড় আশ্রয়। যখন মসজিদ, মন্দির, গির্জা, রাষ্ট্র, পরিবার সবাই কাউকে বাইরের মানুষ বানিয়ে দেয়, মাজার তখনও তাকে বলে, “এসো, বসো, একটু গান শুনো, একটু কাঁদো।” সেই আশ্রয়ের ওপর হামলা মানে কেবল কোনো “ভুল আচার” ভাঙা না, বরং প্রান্তিকতার শেষ আড়ালটুকু ছিঁড়ে ফেলা। এই আক্রমণকে রুখতে না পারলে, আগামী প্রজন্ম হয়তো একদিন শুধু বইয়ে পড়বে, “এই দেশে একসময় লালন–ফকির ছিল, মাজারে গান হত, মানুষ ধূপের গন্ধে মাথা রাখত পাথরের গায়ে।” আর আমাদের বর্তমান প্রজন্মের লজ্জা হবে এই ভেবে, আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বাঙালির সেই বহুলতা পোড়াতে দিয়েছিলাম।
26 Responses
বাঙালির সংস্কৃতি ও ওয়াহাবি আগ্রাসন শিরোনামটাই আজকের বাংলাদেশকে খুব পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করে। লালনের দেশ, সুফি মাজার, বাউল গান, দুর্গা পূজা সব কিছুর ওপর একদিকে হামলা, আরেকদিকে টার্গেটেড ঘৃণা এগুলোকে ওয়াহাবি প্রভাব ছাড়া বোঝা কঠিন।
তুই হিন্দু নাস্তিক, তাই মুসলমানের যে কোনো ধার্মিক চর্চাই তোর কাছে ওয়াহাবি আগ্রাসন মনে হয়। সূরা পড়ে, দাড়ি রেখে, বোরকা পরে চললেই কি সবাই জঙ্গি? তুই ইসলামকে এতটাই ঘৃণা করিস যে নিজের সমাজের ঈমানদারিত্বকেই আক্রমণ বলে দেখাস।
তুমি ভালোভাবে টেনে এনেছ সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, সোনারগাঁ যেখানে সুফি দরগা, বাউল আশ্রম, এমনকি ৩০০ বছরের মাজার পর্যন্ত হামলার শিকার হয়েছে। এগুলো কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশ না; পুরনো আঞ্চলিক সুফি বাঙালি ধারাকে সরিয়ে খাঁটি আরবীয় ইসলাম বসানোর প্রকল্প।
ওয়াহাবি ওয়াহাবি বলে চিৎকার করলেও তুই আসলে ইসলামের তাওহিদি আকিদাকেই আক্রমণ করছিস। কবর ওরস, গান বাজনা, পুরোনো অনেক প্রথা আছে যেগুলো ইসলামি শিরক আর বিদআতের সঙ্গে মিশে গেছে ওগুলোকে প্রশ্ন করলেই তুই সেটা বাঙালির সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ বলে চালাস।
তোমার যুক্তিটা পরিষ্কার ওয়াহাবি সালাফি ধারার প্রভাব যত বাড়ছে, ততই লালন, সাধু, আউল বাউল, দরগা, এমনকি পীরদের কবরে হামলা বেড়েছে; সঙ্গে হিন্দু বৌদ্ধ মন্দিরও টার্গেট। একধরনের এক রঙের ইসলাম দিয়ে বাকি সব রঙ মুছে ফেলার চেষ্টা।
তুই লালন, বাউল, সুফি এসবের প্রেমে এত অন্ধ যে তোর কাছে কোরআন হাদিসের কথা বললেই সেটা আরবের আগ্রাসন মনে হয়। মুসলমানের জন্য আল্লাহর কিতাবই ফাইনাল; বাঙালি সংস্কৃতির নামে যদি শিরক আর হারাম চর্চা চলে, সেটা বন্ধ করার আহ্বান ইসলামি দায়িত্ব ওয়াহাবি আগ্রাসন না।
তুমি যে পয়েন্টটা তুলেছ সৌদি ফান্ডেড মসজিদ, মাদ্রাসা, প্রোজেক্টের পাশাপাশি সামাজিক মানসিকতা বদলাচ্ছে; হিজাব, দাড়ি, হারাম হালাল ভাষার বৃদ্ধি, মাজারে যাওয়া নিয়ে লজ্জা এগুলো সব মিলেই বাঙালি মুসলিম পরিচয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
সৌদি টাকা, ওয়াহাবি প্রভাব এসব নিয়ে তোর মতো নাস্তিকরা অনেক গল্প বানায়, কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের উলামা মাশায়েখের অনেকেই দোবন্দি, ব্রেলভি, স্থানীয় ধারার; ওরা সবাইকে ওয়াহাবি বলে গালি দিলে বিশ্লেষণ না, বরং ঘৃণা তৈরিই হয়।
ভালো লাগলো যে তুমি শুধু মুসলমানদের ভেতরের সেক্টারিয়ান সহিংসতা না, হিন্দু মন্দির, পূজা মণ্ডপ, ধর্মীয় শোভাযাত্রার ওপর বাড়তে থাকা হামলাগুলোকেও একই ধারার অংশ হিসেবে দেখিয়েছ। লক্ষ্য একটাই বহুত্বকে ভয় দেখিয়ে একরঙা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দেশ বানানো।
তোর বাঙালি সংস্কৃতি মানে গান, নাচ, মদ, মিশ্র জমায়েত, আর ধর্মকে সম্পূর্ণ প্রাইভেট বানিয়ে ফেলা। এ সবের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তুই তাকে ওয়াহাবি বানিয়ে গালি দিস। আল্লাহর কাছে কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির না, তাওহিদের হিসাবই আগে হবে এটা তুই তরুণদের ভুলিয়ে দিতে চাইছিস।
বাঙালির সংস্কৃতি ও ওয়াহাবি আগ্রাসন শিরোনামটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে যে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এসেছে পহেলা বৈশাখকে হিন্দুয়ানি , নববর্ষ উদযাপন বিদআত , সংগীত নাটক হারাম এসব বলে যে আক্রমণ, সেটা সত্যিই ওয়াহাবি মতাদর্শের প্রভাব।
তুই আবারও ওয়াহাবি বলে গালি দিতে এসেছিস। আল্লাহর তাওহিদ রক্ষা করা, শিরক বিদআত থেকে দূরে থাকা এটা ইসলামের মূল শিক্ষা। তুই এটাকে আগ্রাসন বলিস কারণ তুই নাস্তিক, হিন্দু সংস্কৃতির পক্ষপাতী। বাঙালি সংস্কৃতির নামে শিরক, পৌত্তলিকতা চালানো যাবে না।
তুমি ঠিকই ধরেছ বাংলাদেশে সালাফি/ওয়াহাবি মতাদর্শ ১৯৮০ ৯০ দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল অর্থ ও মাদ্রাসা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছড়িয়েছে। পোশাক, গান, উৎসব, এমনকি ভাষা সবকিছুতেই খাঁটি ইসলামি বনাম অনৈসলামিক বাইনারি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তুই মধ্যপ্রাচ্যের তেল অর্থ বলে মনে করিয়ে দিতে চাস, ইসলাম বিদেশি, বাঙালি সংস্কৃতি আসল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা মুসলিম প্রথম, বাঙালি পরে। ইসলাম যা নিষিদ্ধ করেছে মূর্তি, পৌত্তলিকতা, নারী পুরুষের মেলামেশা সেগুলো সংস্কৃতি র নামে চালানো যাবে না।
ভালো লাগল যে তুমি পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, রবীন্দ্র নজরুল এসবের ওপর হামলার ঘটনাগুলো উল্লেখ করেছ। ২০১৬ সালে রমনার বটমূলে হামলার হুমকি, ২০২১ এ মঙ্গল শোভাযাত্রায় বাধা এসব দেখায়, একটা গ্রুপ পরিকল্পিতভাবে বাঙালি সংস্কৃতিকে মুছে ফেলতে চাইছে।
আল্লাহর নামে কসম করে বলি, পহেলা বৈশাখে মূর্তি নিয়ে মিছিল, হিন্দু দেব দেবীর প্রতীক এসব মুসলিম দেশে বৈধ না। রমনার বটমূল, ছায়ানটের অনুষ্ঠান এগুলো হিন্দুয়ানি রীতি, ইসলামের সাথে মেলে না। এগুলো বন্ধ করা আগ্রাসন না, ঈমান রক্ষা।
তুমি যেভাবে সাংস্কৃতিক পরিচয় আর ধর্মীয় পরিচয় এর দ্বন্দ্ব দেখিয়েছ, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ কি মুসলিম দেশ, নাকি বাঙালি দেশ এই প্রশ্নটা রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি সবখানে জটিল করে তুলছে। ওয়াহাবি দৃষ্টিভঙ্গি বলে, মুসলিম প্রথম, বাঙালি পরিচয় গৌণ।
তুই বারবার ওয়াহাবি বলিস, কিন্তু আসলে তুই সব সালাফি, তাবলীগ, হানাফি মাজহাবের রক্ষণশীল আলেম সবাইকে এক থলে করে ফেলিস। বাস্তবে অনেক ধারা আছে, কিছু উগ্র, কিছু মধ্যপন্থী। তুই শুধু ওয়াহাবি বলে সবাইকে ভিলেন বানাস, এটা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।
ভালো হয়েছে তুমি পোশাক, দাড়ি, হিজাব, বোরকা এসবের রাজনীতি নিয়েও লিখেছ। যে মেয়েরা ১৯৭০ ৮০ দশকে শাড়ি, ব্লাউজ পরত, এখন তাদের মেয়েরা আবায়া, নিকাব পরে এটা স্বেচ্ছা, নাকি সামাজিক চাপ? অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েরা বাধ্য হয়, আধুনিক দেখালে বেহায়া বলা হয়।
তোর লেখা পড়ে মনে হয়, হিজাব, আবায়া পরা মেয়েরা সবাই চাপে পরে পরছে নিজের ইচ্ছায় কেউ পরে না। এটা অনেক মুসলিম নারীর প্রতি অপমান, যারা স্বেচ্ছায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পর্দা করে। তুই স্বাধীনতা র নামে আসলে পর্দা খুলে ফেলতে চাস।
তুমি স্পষ্ট দেখিয়েছ ওয়াহাবি প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। মসজিদ, মাদ্রাসা, খুতবা, ওয়াজ সবখানে বলা হচ্ছে: বাঙালি ঐতিহ্য মানেই জাহিলিয়াত , শুধু আরব ইসলামি প্র্যাকটিসই সহিহ । এতে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা, শিল্প সব হুমকির মুখে।
তুই আরব ইসলাম বলে আরবদের দোষ দিস, কিন্তু ইসলাম তো আরবেই নাজিল হয়েছে। কুরআন আরবি ভাষায়, নবীজি আরব, মক্কা মদিনা আরবে। আরবি সংস্কৃতিকে অনুসরণ করা ইসলামের অংশ। তুই বাঙালি সংস্কৃতি বলে হিন্দু বৌদ্ধ প্রভাবকে বৈধতা দিতে চাইছিস।
ভালো লাগল যে তুমি শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কথাও এনেছ মাদ্রাসা শিক্ষার সম্প্রসারণ, কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি, স্কুল পাঠ্যবইয়ে ধর্মীয় বিষয়বস্তু বাড়ানো এসব ধীরে ধীরে শিক্ষা ব্যবস্থাকে একমুখী, সংকীর্ণ করে ফেলছে। সেক্যুলার, বৈজ্ঞানিক, মুক্তচিন্তার জায়গা কমছে।
কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষা তো লাখ লাখ গরিব পরিবারের সন্তানের একমাত্র সুযোগ। তুই সেক্যুলার শিক্ষা বলিস, কিন্তু সেটা তো ধনীদের জন্য ইংরেজি মাধ্যম, প্রাইভেট স্কুল। কওমি মাদ্রাসাই একমাত্র জায়গা যেখানে গরিব ছেলেরা বিনা খরচে পড়ে। তুই এগুলো বন্ধ করলে তারা কোথায় যাবে?
তুমি ঠিকই বলেছ ওয়াহাবি প্রভাব শুধু রক্ষণশীল নয়, এটা পলিটিক্যাল প্রজেক্ট। রাজনৈতিক দল, সশস্ত্র গোষ্ঠী, মসজিদ কমিটি সবাই মিলে একটা সাংস্কৃতিক হেজিমনি তৈরি করছে, যেখানে ভিন্ন মত, ভিন্ন চর্চা, ভিন্ন পরিচয় কোনোটাই সহ্য করা হয় না।
তোর লেখায় ওয়াহাবি , সালাফি এসব শব্দ দিয়ে তুই মূলত ইসলামকেই আক্রমণ করছিস। আল্লাহর তাওহিদ রক্ষা, শিরক বিদআত থেকে দূরে থাকা এটাই ইসলামের মূল। ত