৩৬ জুলাই ও আমাদের নতুন স্বাধীনতা

৫ আগস্ট ২০২৪, দুপুর আড়াইটার সামান্য আগে বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। তিন সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী ছাত্র আন্দোলন, শত শত লাশ, হাজারো গ্রেপ্তার, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, কারফিউর পর হঠাৎই খবর ছড়াল, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং সামরিক হেলিকপ্টারে করে গোপনে দেশ ছেড়ে ভারতের দিকে উড়ে গেছেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই টেলিভিশনে এসে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার–উজ–জামান ঘোষণা করলেন, প্রধানমন্ত্রী তার পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছেন, সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। একই সময়ে গণভবনের সামনে জড়ো হওয়া হাজার হাজার মানুষ লোহার গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল; কেউ দেয়ালে “স্বৈরাচার নিপাত যাক” লিখল, কেউ বঙ্গবন্ধুর বিশাল মূর্তির মাথায় রঙ–তুলি, কেউ রাষ্ট্রীয় গাড়িতে আগুন দিল, কেউ কেবল মাটিতে শুয়ে কাঁদল আনন্দে।
 
এই মুহূর্তের পূর্বসূত্র খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় জুলাইয়ের মাঝামাঝি। কোটার রায়ের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন শেখ হাসিনার “রাজাকার” মন্তব্যের পর এমনিতেই সারা দেশে গণ–অসন্তোষে রূপ নিয়েছিল; ১৫ জুলাই থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণ, লাঠিচার্জ, গুম আর নির্যাতনে প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হয়, যার মধ্যে স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, পথচারী, এমনকি শিশুও ছিল। ১৮ জুলাই থেকে ১১ দিন ধরে মোবাইল ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে, রাতে–ভোরে হোস্টেল–বাড়িতে অভিযান চালিয়ে, হাজার হাজার ছাত্র–যুবককে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে, “দাঙ্গাবাজ”, “রাষ্ট্রদ্রোহী” বলে মামলা দিয়ে পুরোনো পরিচিত দমন–যন্ত্র আরও নির্মমভাবে চালানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রত্যাশার উল্টোটা হল: ২৯ জুলাই থেকে আবারও রাস্তায় নেমে এল লাখো মানুষ; “স্টুডেন্টস এগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন” এবার এক দফায় নেমে এল, শেখ হাসিনার পদত্যাগ ছাড়া আর কিছুই চলবে না।
 
৪ আগস্ট ঢাকায় শাহবাগ, প্রজন্ম চত্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পরিণত হল এক সমুদ্র জনসমুদ্রে; ছাত্র, শ্রমিক, গার্মেন্টস–কর্মী, রিকশাওয়ালা, গৃহিণী সবাই “নন–কো–অপারেশন” ডাকে সাড়া দিয়ে রাস্তায় বসে পড়ল, দোকান বন্ধ, গাড়ি বন্ধ, অফিস বন্ধ। কোটার দাবির জায়গায় এখন স্লোগান, “হাসিনার বিচার চাই”, “খুনি সরকারের পতন চাই”, “এই লাশের দায় কার”, “শুধু কোটার সংস্কার নয়, ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের অবসান চাই।” সামরিক–বেসামরিক প্রশাসনের ভেতরেও এসময় ফাটল ধরা শুরু করে; কিছু জেলা প্রশাসক, পুলিশ অফিসার, এমনকি মন্ত্রীরাও অফ–দ্য–রেকর্ড বলতে থাকে, এত রক্তের দাগ আর বয়ে নেওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, প্রতিবেশী দেশগুলো একের পর এক বিবৃতি দিয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও গণহত্যার তদন্ত, রাজনৈতিক সমঝোতা, নির্বাচনোত্তর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কথা বলতে থাকে।
 
একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে এই পতনের দৃশ্য দেখতে দেখতে মিশে যায় অনেক ব্যক্তিগত অনুভূতি। প্রায় দেড় দশক ধরে আমরা এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতায় বসবাস করেছি; একদিকে অবকাঠামো, জিডিপি, পোশাকশিল্প, বিদ্যুৎ–উৎপাদনের সাফল্যের গল্প, অন্যদিকে বিরোধী কণ্ঠের ওপর র‍্যাবের গুলি, গুম, মিথ্যা মামলা, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, নির্বাচনের নামে প্রহসন। ২০১৩–১৪’র শাহবাগ থেকে ২০১৮’র কোটাবিরোধী আন্দোলন, ২০২০–২২’র ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ, প্রতিটি সংগ্রামই শেষ পর্যন্ত তার গায়ে “বিরোধী ষড়যন্ত্র”, “রাজাকার”, “জামাত–শিবির” তকমা সেঁটে দেওয়া রাষ্ট্রকে আরও নির্মম বানিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪–এর জুলাই–আগস্ট ছিল এক ধরনের মোক্ষম ফাটল, যেখানে নতুন প্রজন্ম সেই ভয়ের ভাষা আর মানতে চায়নি; তারা প্রকাশ্যে “আমিই রাজাকার” বলে গালি কেড়ে নিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ হলেও অফলাইনে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, আর শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী মুখকে পালাতে বাধ্য করেছে।
 
৫ আগস্টের পরে অনেকে একে “মৌসুমি বিপ্লব”, “জুলাই বিপ্লব”, “জেন–জেড রেভলুশন” নামে ডাকছে; হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, এটি ছাত্র–নেতৃত্বাধীন এক ঐতিহাসিক জন–অভ্যুত্থান, যা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতির প্রকৃতি বদলে দিয়েছে। কিন্তু একই সাথে সতর্ক কণ্ঠও আছে; সামরিক বাহিনী যে আন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষণায় নিজেকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় বসিয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে আবারও সেনা–সমর্থিত অগণতান্ত্রিক কাঠামোর ঝুঁকি স্পষ্ট। স্টুডেন্টস এগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশনের নেতারা তাই প্রথম দিন থেকেই বলেছে, “আমরা এক স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছি, আরেক সামরিক শাসন মেনে নেব না”, আর সংবিধান সংশোধন, নিরাপত্তা–খাত সংস্কার, সংখ্যালঘু ও নারীর অধিকার সুরক্ষা, মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষের রূপরেখা সামনে রেখেছে।
 
৩৬ জুলাই কথাটা তাই শুধু মেমে না, এক বিশেষ মানসিকতার প্রতীক। আমরা ক্যালেন্ডারেও খুঁজে পাই না এই দিনটাকে, কিন্তু রাজনৈতিক স্মৃতিতে সেটি হয়ে গেছে নতুন এক স্বাধীনতা–দিবসের মতো, যখন মানুষ প্রথমবারের মতো বুঝল, এক দল, এক পরিবার, এক নেতার বাইরে গিয়েও রাষ্ট্র কল্পনা করা যায়। এই নতুন স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে হলে এখন সবচেয়ে জরুরি হল, সেই রাস্তায় পড়ে থাকা ছাত্রদের রক্ত, গুম হওয়া মানুষের অদৃশ্য কবর, নির্যাতিত নারীর কান্না, সংখ্যালঘু পুড়িয়ে দেওয়া বাড়িগুলোর ধোঁয়া — এসবের ন্যায়বিচারের একটা সৎ প্রক্রিয়া শুরু করা। নইলে, ৫ আগস্ট শুধু আরও এক “শাসক পরিবর্তন” হয়ে থাকবে, আর আমাদের নতুন প্রজন্ম আবারও শিখবে, এ দেশে বিপ্লব মানে শুধু পুরোনো পতাকা নামিয়ে নতুন পতাকা ওড়ানো, কাঠামো একই রেখে।

33 Responses

  1. ৩৬ জুলাই ও আমাদের নতুন স্বাধীনতা এই টাইটেলটাই পুরো মুভমেন্টের মুড ধরেছে। আমরা আসলে ক্যালেন্ডারেই লিখে রাখলাম, ৫ আগস্ট কোনো সাধারণ তারিখ না, জুলাইয়েরই এক্সটেনশন; রক্ত, গ্যাস, ইন্টারনেট বন্ধ, মিছিল সবকিছুর স্মৃতি মিলিয়ে ৩৬ জুলাই।

  2. তুই আবার শুরু করলি বিপ্লবও পিতৃতান্ত্রিক টাইপ কথা। আল্লাহর মেহেরবানি যে এই জাতিটা একবার অন্তত জালিম সরকারের হাত থেকে বাঁচলো, সেটা মানার বদলে তুই শুধু ছিদ্র খুঁজে দেখাচ্ছিস কত কম সংখ্যক নারী লিডার, কত কম কুইয়ার ফ্ল্যাগ ইত্যাদি।

  3. তুমি খুব সুন্দরভাবে লিখেছ এই ৩৬ জুলাই আসলে অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ আর অসমাপ্ত গণতন্ত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নতুন মাইলফলক। কোটা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১ হাজারের বেশি শহীদের রক্ত সেটা শুধুই চাকরির প্রশ্ন না, রাষ্ট্রের শাসনের প্রশ্ন হয়ে গেছে।

  4. তুই সব কিছুতেই বিপ্লবের ভিতর কুইয়ার, এলজিবিটি, নারীবাদ ঢুকাইতে চাস। ৩৬ জুলাই তো মূলত ছাত্র জনতার আন্দোলন ছিল, আল্লাহ, জাতীয় পতাকা, শহীদের ছবি এসবেই তো রাস্তা ভরে ছিল; তোর মনপছন্দ ফ্ল্যাগ না দেখলেই গতর জ্বলে ওঠে কেন?

  5. ভালো লেগেছে যে তুমি ৩৬ জুলাইকে শুধু আবেগ না, পলিটিক্যাল প্রজেক্ট হিসেবেও দেখেছ। একদিকে বাংলাদেশ ২.০ , দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস ধরনের স্লোগান, অন্যদিকে পুরোনো আমলাতন্ত্র, সেনা বুরোক্রেসি, ইসলামিস্ট পলিটিক্স সবই টিকে আছে; তাই নতুন স্বাধীনতার প্রশ্নটা জরুরি।

  6. আল্লাহর রহমতে জালিম সরকার গেছে, সেটার কৃতজ্ঞতা না করে তুই শুধু মব জাস্টিস , ফ্যাসিজম ২.০ বলেই চলেছিস। আল্লাহ যদি এই জাতিকে আরেকটা সুযোগ ন দেন, নতুন কোনো কুমির আবার গিলে নেয়, তখন এই ৩৬ জুলাইকেও তুই ব্লগে রোমান্টিক ভুল বানিয়ে ফেলবি।

  7. তুমি যে লাইনটা এনেছ এই স্বাধীনতা কি কেবল কিছু মুখ্যমন্ত্রীর, নতুন কমিশনারদের, না কি সেই অচেনা মেয়েটারও, যার হাতে প্রথম প্ল্যাকার্ড ছিল এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ৩৬ জুলাইকে কেবল কয়েকজন নেতা আর জেনারেলের গল্প বানানো যাবে না।

  8. সব কিছুতে তুই জেনারেল, সেনা পরামর্শ বোর্ড, এলিট প্যাক্ট নিয়ে পড়ে থাকিস, যেন জনগণের জাগরণে আল্লাহর কোনো ভূমিকা নাই। তোর কাছে সবই মানবিক, সেক্যুলার, এলিট প্রজেক্ট; আল্লাহকে সমীকরণ থেকে বাদ দিতে পারলেই তোর চিন্তা শান্তি পায়।

  9. ভালো হয়েছে যে তুমি Egyptian Arab Spring, Hong Kong, Sudan এই সব যুব নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের উদাহরণ এনে বলেছ, স্ট্রিট থেকে স্ট্রাকচারে যে জাম্পটা লাগে, আমরা সেটা এখনো পারিনি। ৩৬ জুলাই আমাদের জন্য গর্ব, কিন্তু একইসাথে সতর্কবার্তাও।

  10. তোর কাছে ৩৬ জুলাই মানে যেন শুধু আওয়ামী লীগকে সরানো। কিন্তু ১৫ বছরের জুলুম, গুম, ক্রসফায়ার, ব্লগার হত্যা, কোটা বিক্ষোভে গুলি এসবের কোনো ডিটেইলড আলোচনা নাই, যেন পুরনো সব দোষেই পানি পড়ে গেছে। নতুন সেটআপকে গালি দিতেই ব্যস্ত।

  11. মো. সোলায়মান হোসেন says:

    তুমি ঠিকই দেখিয়েছ, ৩৬ জুলাই নামটাই একধরনের ক্যালেন্ডার বিদ্রোহ। মানুষ আগস্টকে মানতে চাইনি, কারণ সেই মাস শেখ হাসিনার দমন রাজনীতির প্রতীক ছিল; তাই আগস্ট ৫ কে জুলাইয়েরই ধারাবাহিক দিন হিসেবে গোনা এটা রাজনৈতিক ভাষা।

  12. তুই ৩৬ জুলাইকে সেক্যুলার বিপ্লব বানাতে চাস, অথচ রাস্তা ভরে ছিল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ , আল্লাহু আকবর , জুলুমের বিচার চাই এসব স্লোগানে। ছাত্ররা পতাকা ধরেছে ঠিকই, কিন্তু আল্লাহর নামও একইভাবে ছিল; এই বাস্তবতাকে তুই পাত্তা দিস না।

  13. ভালো লাগলো যে তুমি শহীদদের পরিসংখ্যান হালকা করে দেখাওনি ১,৪০০ এর বেশি নিহত, কয়েক হাজার গুলিবিদ্ধ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, ইয়েলো প্রেস সব উল্লেখ আছে। নতুন স্বাধীনতার গৌরবের পাশে এই রক্তের হিসাব ভুলে গেলে বিপদ।

  14. আবারও দেখলাম, তোর কাছে সব শহীদ মানেই নাস্তিক, ফেমিনিস্ট, কুইয়ার বন্ধু ক্যাটাগরির। অথচ মাঠে ছিল মাদ্রাসার ছাত্র, নরমাল ধার্মিক মুসলিম, গ্রাম থেকে আসা ছেলেপেলেও ওদের তুই একেবারেই রিপ্রেজেন্ট করিস না, শুধু নিজের বাবুদের ভাষা নিয়ে ব্যস্ত।

  15. নতুন স্বাধীনতা নিয়ে তোমার সন্দেহটা যথার্থ নতুন কমিশন, নতুন কোর্ট, নতুন চার্টার সবই যদি পুরোনো ভোটহীনতা, মব জাস্টিস আর সংখ্যালঘু বিরোধী রাজনীতির ওপর দাঁড়ায়, তাহলে তো এটি কেবল স্বাধীনতার রিব্র্যান্ডিং ।

  16. তুই সবসময়ই ক্লান্ত নৈরাশ্যবাদী। ৩৬ জুলাইয়ের মত একটা অভূতপূর্ব মুভমেন্টের পরেও তোর কনক্লুশন সবই ফ্যাসিবাদ , সবই পিতৃতন্ত্র । মানুষের জাগরণ, সাহস, শহীদের রক্ত এসবের প্রতি কোনো কৃতজ্ঞতা নেই, শুধু আইডিওলজি চালাইতে ব্যস্ত।

  17. তুমি ৩৬ জুলাইকে ভাষার রাজনীতি দিয়েও দারুণ বিশ্লেষণ করেছ কীভাবে গ্রাফিতি, স্লোগান, মেম কালচার, রাজাকার সরকার , ৩৬ জুলাই আমাদের এসব শব্দ এই মুভমেন্টকে চিনিয়ে দিয়েছে। আমাদের প্রজন্মের রাজনীতি সত্যিই শব্দ আর্ট মিডিয়া মিশ্র একটা জিনিস।

  18. কিন্তু একটাও জায়গায় তুই আল্লাহর নাম নিলি না একটা মুসলিম দেশের বিপ্লবে আল্লাহর কদর, কুনফা ইয়াকুন, দোয়া এসবের কোনো mentions নাই, শুধু মানবিক ভাষা। ঈমানকে সাইডলাইনে রেখে কোনো নতুন স্বাধীনতা আসলে টেকেই না, ইতিহাসই তা বলে।

  19. তুমি ভালো করেই ধরেছ, বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা এখন মেমোরি নিয়ে রাষ্ট্র ৩৬ জুলাইকে কেবল ডে অব ভিক্টরি বানাতে চায়, আর স্টুডেন্টরা এটাকে ডে অব অ্যাকাউন্টেবিলিটি বানাতে চায়। শেষ পর্যন্ত যে বর্ণনাটা জিতবে, ভবিষ্যৎ রাজনীতিও মূলত সেটার ওপর দাঁড়াবে।

  20. তোর লেখার একটা জায়গা ভালো লেগেছে তুই বলেছিস, এই আন্দোলন কোনো একক নেতার না; তাই ভবিষ্যতে কোনো একক নায়কের হাতে সব ক্ষমতা তুলে দেওয়াও উচিত না। অনেকে এখনও নতুন বঙ্গবন্ধু , নতুন ত্রাতা খুঁজে বেড়াচ্ছে ওদের জন্য এই সতর্কতা দরকার ছিল।

  21. আবারও দেখলাম, তুই সেনাবাহিনীর যেকোনো ভূমিকা দেখলেই ডিপ স্টেট , প্যালেস কু ইত্যাদি তত্ত্ব বের করতে ভালোবাসিস। অথচ বাস্তবে তাদের না থাকলে হয়তো হাসিনা এত সহজে যেতে চাইত না; এই কমপ্লেক্সিটিটা মাথায় রাখলে বিশ্লেষণটা বেশি হতো।

  22. ৩৬ জুলাই মানে, আমরা আর কোনোদিন জুলাইকে শেষ হতে দেব না তোমার এই লাইনটা খুব ইমোশনাল। ছাত্রদের চোখে এই এক মাসের লড়াই একটা নতুন collective স্মৃতি তৈরি করেছে, যা ৭১-এর পরে প্রথমবার এত তীব্রভাবে জাতিকে নাড়া দিয়েছে।

  23. তুই শহীদের রক্তের কথা বলিস, কিন্তু সেদিন পুলিশ, র‌্যাব, সাধারণ মুসলিম অংশও তো মারা গেছে, আহত হয়েছে। কেবল একদিকের কষ্টকে শহীদ আর আরেকদিকে সবকিছুকে দালাল বানালে, আবার নতুন বিভাজনই তৈরি হবে।

  24. তুমি যে অংশে ২০১৩ শাপলা, কোটা আন্দোলন, সেফ রোড, DSA বিরোধী আন্দোলন সবগুলোর সুতোগুলো এক করে লিখেছ, সেটা খুব দরকারি। দেখা যাচ্ছে, ৩৬ জুলাই হঠাৎ আসেনি; দশ বছরের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ।

  25. কিন্তু তুই কখনও লিখিস না, ওই সব আন্দোলনের ভেতরে ভারতের প্রভাব, এনজিওগুলোর ফান্ড, পশ্চিমা মিডিয়ার ভূমিকা এসব কী ছিল। ৩৬ জুলাইকে খাঁটি বাংলাদেশের জাগরণ বানাতে গিয়ে এই আন্তর্জাতিক খেলাগুলোকে নীরবে সাদা সাবান মাখিয়ে ফেলিস।

  26. তুমি ভালোভাবে তুলে ধরেছ, ৩৬ জুলাই আমাদের সংবিধান চিন্তাকেও বদলেছে নতুন চার্টার, মানবাধিকার কমিশন, নারী কমিশন, সত্য উদ্ঘাটন কমিশন এসবের ভিত্তি সবই এই এক মাসের রাস্তায়। দুঃখের বিষয়, একই রাস্তায় আবার মব জাস্টিসের সংস্কৃতিও টিকে আছে।

  27. লেখাটা পড়ে মনে হলো, তুমি ৩৬ জুলাইকে একদিকে উদযাপনও করছ, আবার অন্যদিকে গভীর শোকের কাজও করছ এই দ্বৈত অনুভূতিটা আমাদের বহুজনের। হাসিনার পতন দেখে খুশি, আবার নতুন বাস্তবতা দেখে ভয় তুমি এই কনফ্লিক্টটা ভালো ধরে ফেলেছ।

  28. তবে তোর সব লেখায় যেমন থাকে, এখানে-ও কুইয়ার , এলজিবিটি , নারীবাদ এসবকে disproportionate জায়গা দিয়েছিস। বাস্তবে মাঠে যারা ছিল, তাদের ৯৯% এসব এজেন্ডা নিয়ে ভাবেও না; তুই নিজের প্রিয় বিষয়গুলোকে বিপ্লবের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে চাইছিস।

  29. মো. রাব্বানী সিদ্দিক says:

    তুমি ৩৬ জুলাইয়ের গ্রাফিতি, গান, স্লোগান নিয়ে যে বিস্তারিত লিখেছ বিশেষ করে কারার ঐ লৌহ কপাট , রক্ত গরম মাথা নষ্ট এসব যে আবার ফিরেছে, সেটা জানাটা প্রয়োজন ছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমাদের প্রতিটি জাগরণেই গান ছিল অস্ত্র।

  30. তোর জিহ্বা দিয়ে জয় বাংলা শব্দও বের হয় না, এইটা দুঃখজনক। ৩৬ জুলাইয়ের রাস্তায় যে স্লোগানটা আবার ফিরে এসেছে, সেটা কেবল আওয়ামী লীগের না, পুরো জাতির; তুই সেটাকেও নতুন ন্যাশনালিজম বলে ব্যঙ্গ করছিস।

  31. ভালো লেগেছে যে তুমি স্পষ্ট লিখেছ ৩৬ জুলাই কোনো শেষ না, বরং শুরু। যে ছাত্র প্রজন্ম এই বিপ্লব করেছে, তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে, তারা কি নিজেরাও ক্ষমতায় গিয়ে নতুন হাসিনা হয়ে যাবে, না কি সত্যি সত্যিই আলাদা কিছু করবে।

  32. তুই অনেক ডেটা, রিপোর্ট, ইন্টারন্যাশনাল আর্টিকেল রেফারেন্স দিয়েছিস, ভালো; কিন্তু রাস্তার সাধারণ মানুষের ভাষা, আল্লাহভীরু বৃদ্ধ মায়েদের দোয়া, গ্রাম থেকে শহরে আসা শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা এসব খুব কম। ফলে ৩৬ জুলাই বেশি এলিট কাহিনি হয়ে গেছে।

  33. তবুও, ৩৬ জুলাইকে নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলছে, এই স্বাধীনতা কি সত্যি সবার জন্য? সেটা দরকারি। blind সেলিব্রেশন থেকে বেরিয়ে আসা না গেলে আমরা আবারও কোনো নতুন স্বৈরাচারের জন্য দরজা খুলে রাখব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *