বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৩ বছর পূর্তিতে টেলিভিশনের পর্দায় যখন আতশবাজি, শোভাযাত্রা, উন্নয়নের পরিসংখ্যানের ঝলকানি চলছিল, তখন দেশের লাখো নারীর জীবনের বাস্তবতা যেন সেই আলোর বাইরে অন্ধকার গলিতে পড়ে ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণে বললেন, দেশ অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়নে অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি করেছে; আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নারী–অধিকার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। কিন্তু একই সময়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন জরিপের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের প্রতি দশ জন নারীর সাত জন তাদের জীবনে অন্তত একবার স্বামীর হাতে শারীরিক, যৌন, মানসিক বা অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন, আর চার জন গত এক বছরে এই সহিংসতা সহ্য করেছেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা আর নারীর দেহ–মন–জীবনের স্বাধীনতার মধ্যে বিশাল ফাঁক রয়ে গেছে।
অনেকেই যুক্তি দেন, বাংলাদেশে তো বছরের পর বছর দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারী, সংসদে নারী–সংরক্ষিত আসন আছে, প্রশাসনে নারী ডিসি–এসপি, কর্পোরেট বোর্ডে নারী ডিরেক্টর, আন্তর্জাতিক ফোরামে নারী মুখ; তাহলে আবার নারীর স্বাধীনতার অভাব কোথায়? সত্যটি হল, নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নারীমুক্তি আনে না, যদি সেই নেতৃত্ব পুরুষতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী কাঠামোর ভেতর থেকেই কাজ করে এবং সেই কাঠামোকে প্রশ্ন না তোলে। গবেষকরা দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের নারী নেত্রীদের বড় অংশই পুরুষ–কেন্দ্রিক দলীয় রাজনীতির ভেতর নিজেরা টিকে থাকার কৌশলে ব্যস্ত, যার ফলে তারা অনেক সময় সামগ্রিক নারীমুক্তির প্রশ্নে আপস করে বা নীরব থাকে। একই সঙ্গে নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ হতাশাজনকভাবে কম আছে; ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাত্র প্রায় পাঁচ শতাংশ প্রার্থী নারী ছিলেন, এবং পার্টিগুলো এখনও নেতৃত্বের এক–তৃতীয়াংশ নারী রাখার নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ পালন করতে পারেনি।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ছবিটা দুই রকম। একদিকে, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য ডাটার হিসাবে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ গত দুই দশকে বেড়েছে, পোশাকশিল্প ও সেবা–খাতে কোটি নারী নতুন আয়ের সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে, পুরুষদের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ এখনো আশঙ্কাজনকভাবে কম, প্রায় অর্ধেক কর্মক্ষম নারীই কাজের বাজারের বাইরে, এবং যারা কাজ করেন, তাদের গড় আয় পুরুষের আয়ের প্রায় অর্ধেক। অনেক নারী মজুরি পেলেও পরিবারের পুরুষ সদস্যের হাতে সেই আয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকে; উত্তরাধিকার আইনের বৈষম্যের কারণে সম্পত্তির ওপর নারীর স্বায়ত্তশাসন সীমিত, যা রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নিজের জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও ব্যাহত করে।
নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটা উঠে আসে সহিংসতার পরিসংখ্যান থেকে। ২০২৪ সালের সহিংসতা বিষয়ক জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, জীবদ্দশায় অন্তত ৭০ শতাংশ নারী ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার, আরেকটি ব্যাখ্যায় এই হার ৭৬ শতাংশের মতো, যা বিশ্ব গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। গত এক বছরের ভেতর ৪১ থেকে ৪৯ শতাংশ নারী স্বামীর হাতে মারধর, যৌন সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ বা চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা সহ্য করেছেন; স্বামীর দ্বারা শারীরিক সহিংসতার ঝুঁকি অন্য সবার তুলনায় তিন গুণ, আর যৌন সহিংসতার ঝুঁকি ১৪ গুণ বেশি। অর্থাৎ, বাংলাদেশের নারীর জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ জায়গা প্রায়শই নিজের বাসাই, আর তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি–বাহক সেই ব্যক্তি, যাকে সমাজ ও আইন বিবাহের মাধ্যমে তার “রক্ষক” হিসেবে বৈধতা দেয়।
এই অবস্থায় একজন উভকামী, নাস্তিক, নারীবাদী নারী হিসেবে যখন “স্বাধীনতার ৫৩ বছর” শুনি, তখন প্রশ্ন জাগে, এই স্বাধীনতা আসলে কার? গ্রামের ভিটেতে বসে থাকা সেই নারী, যে স্বামীর মার খেয়ে বাবার বাড়ি ফিরতে পারে না, কারণ সমাজ তাকে “বেআব্রু” বলে; শহরের অফিসে কাজ করে রাতে বাড়ি ফিরতে গিয়ে রিকশা–বাসে হয়রানির শিকার হয়; ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানির অভিযোগ করলে প্রোক্টরের গালিগালাজে শেষে আত্মহত্যার কথা ভাবে; কুইয়ার নারী হিসেবে নিজের যৌনতা লুকিয়ে বিয়ে করে তারপর সারাজীবন নিজের শরীরের প্রতি অপরাধবোধ নিয়ে দিন কাটায়, আর ধর্মীয়–রাষ্ট্রীয় আইন তাকে কোনো বিকল্পই দেয় না, তাদের কাছে স্বাধীনতা শব্দটা কাগজের বইয়ের মতোই দূরের কিছু।
অবশ্যই অগ্রগতি হয়েছে; মেয়েরা আগের চেয়ে বেশি স্কুল–কলেজে যাচ্ছে, মেডিকেল–ইঞ্জিনিয়ারিং–বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের উপস্থিতি অনেক বেড়েছে, নারীর আয়ের সুযোগ বেড়েছে, অনেক নারী ব্যবসায়ী, স্টার্টআপ–ফাউন্ডার, গবেষক, লেখক হিসেবে উঠে আসছেন। কিন্তু একই সাথে বাল্যবিবাহ, যৌতুক, ধর্ষণ, অ্যাসিড–নিক্ষেপ, অনলাইন হয়রানি, কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়ন, রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার নারী এমনকি নারী–নেত্রীদের প্রতিও কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ দেখায়, স্বাধীনতার অর্ধেক বা এক–তৃতীয়াংশই যেন নারীদের হাতে এসেছে, বাকিটা এখনও পুরুষতন্ত্রের লকারে বন্দি আছে।
তাই স্বাধীনতার ৫৩ বছরের এই মোড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে সৎ প্রশ্নটা করা দরকার, আমরা কি নারীর স্বাধীনতাকে সত্যি রাষ্ট্রের মূল এজেন্ডা বানিয়েছি, নাকি কেবল আন্তর্জাতিক দিবসে, নীতিপত্রে, বক্তৃতায় কিছু শব্দ যোগ করে নিজেদের দায় সেরেছি। যতদিন না আইন, অর্থনীতি, শিক্ষা, রাজনীতি আর ঘরের ভেতরের ক্ষমতার হিসাব পুরোপুরি বদলানো যায়, ততদিন “স্বাধীনতা” শব্দটা বাংলাদেশের কোটি নারীর জীবনে ঠিকমতো অর্থ খুঁজে পাবে না। সেই পরিবর্তন শুরু হতে পারে একেকটা ছোট কর্ম থেকে: ঘরে ছেলের মতো মেয়েকেও উত্তরাধিকার দেওয়া, বসে থাকা শাশুড়ির সামনে ছেলের নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, ক্যাম্পাসে সহিংসতার মামলাকে “ডিপ্রেশন” বলে রিঅব্র্যান্ড না করে কাঠামোগত অপরাধ হিসেবে দেখা, আর সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া যে, শুধু পতাকা উড়িয়ে, স্টেডিয়ামে আতশবাজি ফুটিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন হয় না, সেই স্বাধীনতা তখনই সত্যি হয়, যখন নারীর শরীর, মনের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণের শেষ শিকলটাও খুলে ফেলা যায়।
19 Responses
স্বাধীনতার ৫৩ বছর, নারীর স্বাধীনতা কতদূর? প্রশ্নটা খুবই সময়োপযোগী। ১৯৭১ এ নারীরা যুদ্ধ করেছে, ত্যাগ করেছে; কিন্তু আজও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় মাত্র ২% নারী, বীরাঙ্গনা শব্দটাই এখনো স্টিগমা। ASK এর রিপোর্টও বলছে, নারীর আইনি ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এখনো অপূর্ণ।
তুই হিন্দু নাস্তিক মেয়ে, তাই স্বাধীনতার নাম করে শুধু মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে বিষ ঢালিস। আল্লাহ নারীকে সম্মান দিয়েছে, পর্দা দিয়েছে, অধিকার দিয়েছে তুই সেটা মানিস না বলে স্বাধীনতা মানে কেবল পশ্চিমা নগ্নতা আর ধর্মহীনতা বুঝিস।
তুমি ভালোভাবে দেখিয়েছ ১৯৭১ এ নারীরা গেরিলা, নার্স, তথ্য সংগ্রাহক, আশ্রয়দাতা সব ভূমিকাতেই ছিল, কিন্তু আজও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেতে তাদের প্রমাণ আনতে হয় বেশি, সাক্ষী লাগে বেশি। জেন্ডার বায়াস এখানে খুব স্পষ্ট।
তুই সবসময় নারীর স্বাধীনতা বলে শুধু পশ্চিমা মডেল চাপিয়ে দিতে চাস। অথচ বাংলাদেশে নারী প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, এমপি, ম্যাজিস্ট্রেট সব আছে। তুই সেটা দেখিস না, শুধু অসম্পূর্ণ স্বাধীনতা বলে গালি দিস।
ভালো লাগল যে তুমি শুধু রাজনৈতিক না, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথাও তুলেছ নারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে স্বামীর সই, সম্পত্তি বিক্রিতে পরিবারের চাপ, কর্মক্ষেত্রে বেতন বৈষম্য এসব হলে রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলেও স্বাধীনতা পূর্ণ হয় না।
আল্লাহর বিধান অনুযায়ী নারী পুরুষের দায়িত্ব আলাদা এটাকে তুই বৈষম্য বলিস। স্বাধীনতা মানে আল্লাহর হুকুম ভাঙা না, বরং আল্লাহর হুকুম মেনে সম্মান পাওয়া। তুই আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করে স্বাধীনতার নাটক করছিস এটা কুফরি।
তুমি ঠিকই বলেছ স্বাধীনতা শব্দটা নারীর জন্য এখনো relative; একজন উচ্চবিত্ত শহুরে মেয়ে যতটা স্বাধীনতা পায়, একজন গ্রামীণ গরিব মেয়ে তার ভগ্নাংশও পায় না। শ্রেণি, জাতি, ধর্ম সব কিছু মিলে নারীর স্বাধীনতা নির্ধারণ হয়।
তুই সব সময় বাংলাদেশকে নারীর জেলখানা বানিয়ে দেখাস। অথচ পশ্চিমে domestic violence, rape culture, wage gap সব আছে। তুই শুধু মুসলিম দেশগুলোকেই টার্গেট করিস, এটা তোর বায়াস।
ভালো হয়েছে তুমি বীরাঙ্গনাদের কথা এনেছ যুদ্ধে ধর্ষিত নারীরা স্বাধীন দেশে স্বীকৃতি পায়নি, বরং স্টিগমা পেয়েছে। ১৯৭২ এ বঙ্গবন্ধু বীরাঙ্গনা বলে সম্মান দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সমাজ তাদের গ্রহণ করেনি এটা আমাদের স্বাধীনতার সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায়।
তোর লেখা পড়ে মনে হয়, ১৯৭১ শুধু নারীদের জন্যই যুদ্ধ ছিল। অথচ লক্ষ পুরুষ শহীদ হয়েছে, নির্যাতিত হয়েছে তাদের কথা তুই খুব কম বলিস। সবকিছুকে gender lens দিয়ে দেখলে ইতিহাস বিকৃত হয়।
তুমি যে পয়েন্টটা তুলেছ বাংলাদেশে নারী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সংসদে নারী সংরক্ষিত আসন এখনো নির্বাচিত না, মনোনীত; ফলে তাদের জবাবদিহিতা জনগণের কাছে না, দলের কাছে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ।
আবারও, তুই শুধু সমালোচনা করিস, কোনো সমাধান দিস না। নারীর স্বাধীনতা বাড়াতে হলে পরিবার, শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা সব কিছু মিলিয়ে কাজ করতে হয়; তুই কেবল রাষ্ট্র আর আলেমদের গালি দিয়ে যাস।
ভালো লাগল তুমি আইনি সংস্কারের দিকটাও এনেছ পারিবারিক আইন, উত্তরাধিকার, বিবাহ বিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব এসব এখনো ধর্মীয় পারসোনাল ল-এর আওতায়, যেখানে নারী পুরুষের সমতা নেই। Secular uniform code দরকার, কিন্তু সেটা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তোর লেখায় ইসলামের প্রতি সবসময় বিদ্বেষ থাকে। আল্লাহ নারীকে উত্তরাধিকারে অধিকার দিয়েছে, মাহর দিয়েছে, বিয়ে বিচ্ছেদে নিয়ম দিয়েছে এসবকে তুই বৈষম্য বলিস। শারিয়া অনুসারে নারীর অধিকার ঠিক আছে, সমস্যা হলো মানুষের প্রয়োগে।
তুমি ঠিকই বলেছ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও পথে নারীর চলাফেরা, পোশাক, পেশা সব কিছু নিয়ে পুরুষ সমাজের নজরদারি চলছে। এই নজরদারি কেবল পরিবার বা মোল্লা নয়, রাষ্ট্র ও আইনও অনেক জায়গায় সমর্থন করছে।
তুই কখনও স্বীকার করিস না, মুসলিম সমাজে অনেক নারী নিজেই পর্দা, পরিবার, ধর্মীয় মূল্যবোধ পছন্দ করে। তাদের পছন্দকে তুই false consciousness বলে ফেলিস এটা তাদের প্রতি অসম্মান।
ভালো হয়েছে তুমি কর্মক্ষেত্রে harassment এর কথাও তুলেছ অফিসে, গার্মেন্টসে, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে নারীরা প্রতিদিন যে ধরনের যৌন হয়রানির মুখোমুখি হয়, তার বিরুদ্ধে High Court guideline থাকলেও enforcement খুব দুর্বল।
তোর লেখায় মনে হয়, বাংলাদেশে কোনো ভালো দিক নেই। অথচ গার্মেন্টসে ৪০ লক্ষ নারী কাজ করছে, মাইক্রোক্রেডিটে নারীরা এগিয়ে আসছে, শিক্ষায় gender parity প্রায় পাওয়া গেছে এসব তো progress, এগুলো তুই কেন কম বলিস?
তুমি সুন্দরভাবে দেখিয়েছ স্বাধীনতা মানে কেবল পতাকা ওড়ানো না; নারীর জন্য স্বাধীনতা মানে নিজের শরীর, জীবন, পেশা, সম্পত্তি সব কিছুর ওপর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। সেই অধিকার এখনো পরিবার