একুশের বইমেলা, শব্দটা শুনলেই বুকের মধ্যে একটা আলাদা কম্পন জেগে ওঠে। ছোটবেলায় টেলিভিশনের পর্দায় যে সাদা তাঁবুগুলো দেখতাম, বইয়ের পৃষ্ঠা ওলটাতে থাকা মুখগুলো, কবি–লেখকদের গম্ভীর মুখ আর তরুণদের হাতে বই, সবকিছুর মধ্যে ছিল একরকম পবিত্রতা, যেন এই মেলাই আমাদের মগজের মুক্তির মঞ্চ। সেই পবিত্রতার শরীরে আজ শৃঙ্খল ঝুলছে, লোহার শিকল এর মতো ভারী, ঠান্ডা আর অপমানজনক।
যখন জানতে পারলাম আদর্শ প্রকাশনীকে বইমেলা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তখন রাগ এলেও রাগের চেয়ে লজ্জাই বেশি লাগছিল। মুক্তচিন্তা, যে শব্দটা আমাদের রাষ্ট্র প্রতিদিন গর্ব করে উচ্চারণ করে, সেই শব্দই আজ সরকারের নিজস্ব ভয়ে পরাজিত। যুক্তিবাদ, প্রশ্ন, প্রতিবাদ, এগুলো যেন এখন নিষিদ্ধ বস্তু। ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, এই বাক্যটা আজ রাষ্ট্রের হাতে এমন এক জাদুর শব্দ, যার আড়ালে যে কোনো সত্যিকে নির্বাসিত করা যায়, যে কোনো লেখককে অপরাধী বানানো যায়।
বইমেলাকে আমি অনেকদিন ধরেই একটা মানসিক আশ্রয় ভেবেছি। বিদেশে থাকলেও প্রতি ফেব্রুয়ারিতে মনে পড়ে যায় সেই ভিড়, ধুলোমাখা পা, তারপর এক কাপ চা হাতে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বই নিয়ে তর্ক। কিন্তু এখন যখন দেখি, ‘আঘাতপ্রাপ্ত ধর্মীয় অনুভূতি’-র নামে একের পর এক কণ্ঠ বন্ধ হচ্ছে, তখন মনে হয় এই মেলাটা এখন আমাদের নয়, এটা একদল ভীতু আমলা আর শক্তিশালী ধর্মব্যবসায়ীর। তারা নির্ধারণ করবে কোন বই মানুষ পড়বে, কোন লেখক মঞ্চে উঠবে, আর কোন চিন্তা ‘বিপজ্জনক’ হয়ে উঠেছে।
আমি জানি, এই কথাগুলো এখন বাংলাদেশে বলা মানে নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলা। কিন্তু এই নীরবতাই তো তাদের সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র। যতদিন আমরা চুপ থাকব, তারা নিখুঁতভাবে আমাদের শ্বাসরোধ করবে। মনে পড়ে আমার এক বন্ধু, ঢাকায় এক মফস্বল কলেজে পড়ায়, বলেছিল: “আমরা এখন এমন, মাঝরাতে কেউ দরজায় ঠক ঠক করলে মনে হয় পুলিশ না মৌলবাদী কে জানি!”, এই ভয়টাই রাষ্ট্র এখন স্বাভাবিক করে ফেলেছে। বই নিষিদ্ধ করা তো তারই নরম মুখ।
আদর্শ প্রকাশনী শুধু নিষিদ্ধ হয়নি; তাদের বইগুলোকেও গালাগালি করা হয়েছে “রাষ্ট্রবিরোধী”, “ধর্মবিরোধী” ট্যাগ দিয়ে। অথচ প্রশ্ন করি, রাষ্ট্রবিরোধী মানে কী? যদি রাষ্ট্র অন্যায় করে, মানুষ যদি তার বিরুদ্ধে লেখে, তাহলে কি সেটাই রাষ্ট্রবিরোধিতা? আর ধর্মবিরোধী বললেই তো আরও মজার এক দুনিয়া খুলে যায়, এই ‘ধর্মের’ সংজ্ঞা কে দেবে? ইমাম? মন্ত্রী? নাকি সেন্সর বোর্ডের কোনও কর্মকর্তা? যদি সমালোচনাই ধর্মবিরোধী হয়, তাহলে ধর্মের নিরাপত্তা কিসে?
কখনও কখনও নিজের অভিজ্ঞতার কথাও ভাবি। আমি নারী, আমি উভকামী, আমি নাস্তিক, আমার অস্তিত্বই যেন বাংলাদেশে একধরনের বইমেলার নিষিদ্ধ স্টল। আমার নিজের পরিবার একসময় চায়নি আমি ধর্ম ছেড়ে এমন প্রকাশ্যে ‘অবিশ্বাসী’ পরিচয় দিই। বন্ধুরা বলেছে, “তুমি বিদেশে থাকো, তোমার কথা বলা সহজ।” কিন্তু আমি জানি, এ কথা বলা সহজ নয়। নিজের মাটির প্রতি ভালোবাসা যতটা গভীর, তার ব্যথাও ততটা গভীর। যখন ঢাকায় কারও মুখে শুনি, “ওই নাস্তিক মেয়েটা এখন লন্ডনে নিরাপদে বই পড়ছে”, তখন মনে হয়, নিরাপত্তা নয়, নির্বাসনেই আছি।
আমাদের সমাজে মুক্তচিন্তা একটা পোশাকি শব্দ, যেন অনুষ্ঠানের ব্যানারে ঝুলছে, বাস্তব জীবনে তার স্থান নেই। টেলিভিশনে উপস্থাপক বলবে, “আমরা মুক্তচিন্তার চর্চা চাই”, আর পরের স্ক্রিনে দেখানো হবে এক তরুণ ব্লগারের লাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলবে, “ধর্মের কোনো বিরোধিতা নয়, কেবল গঠনমূলক আলোচনা চাই”, অথচ ধর্ম নিয়ে সত্যিকার প্রশ্ন তোলামাত্র চাকরি চলে যায়। এই ‘গঠনমূলক’ কথার আড়ালে আছে আত্মসমর্পণ।
আমি বিশ্বাস করি, চিন্তার কোনো জাতীয় সীমানা নেই। যুক্তি, প্রশ্ন, বিদ্রোহ, এগুলোই মানুষকে মানুষ করে তোলে। বইমেলা যদি সত্যিই ভাষা শহিদদের স্মৃতিতে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই রাষ্ট্রীয় সেন্সর ভাঙা। কারণ শেখ মুজিবের ভাষণ থেকে শুরু করে হুমায়ুন আজাদের বই, সবই প্রশ্নের সন্তান, অন্ধ আনুগত্যের নয়। বইমেলা মানে তো ‘মেলবন্ধন’, সেখানে যদি ভাবনা আর বিশ্বাস আলাদা ঘরে বন্দি থাকে, তবে এই মেলা কেবল নামেই স্বাধীন।
ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষা করার কথা বলে যারা যুক্তির বই পুড়িয়ে দেয়, তারা জানে না, এই পুড়িয়ে দেওয়া বইয়ের ছাই থেকেই নতুন কণ্ঠ গজাবে। একটি আদর্শ যদি আজ নিষিদ্ধ হয়, আগামী বছর পঁচিশটি নতুন প্রকাশনা সেটি পুনরায় ছাপবে। কারণ শব্দের মৃত্যু হয় না। রাষ্ট্র যতবার সেন্সর বসায়, ততবার সে নিজের ভয়টাকেই প্রকাশ করে।
আজ বইমেলায় যে শিকল পড়েছে, তা আমাদের কণ্ঠের ওপরেও নেমে এসেছে। কিন্তু তবুও লিখব। লিখব, কারণ নীরবতা মানে পরাজয়। লিখব, কারণ যিনি নিজের ভাষার জন্য মরতে পারেন, তিনি নিজের কথার জন্যও দাঁড়াতে জানেন। বইমেলা কোনও ধর্মীয় মঞ্চ নয়, কোনও সরকারি প্রোপাগান্ডার প্রদর্শনীও নয়, এটা চিন্তার মেলা, মানুষের মেলা। সেখানে শিকল মানায় না।
যেদিন বাংলাদেশ এই সহজ সত্যটা বুঝবে, সেদিনই বইমেলা সত্যিকারের মুক্তির উৎসব হয়ে উঠবে, শুধু পাতা নয়, চিন্তাও ওলটাবে।
27 Responses
মুক্ত চিন্তা কি শুধুই স্লোগান? প্রশ্নটা খুবই প্রাসঙ্গিক। আভিজিৎ রায়, নিলয় নীল, রাজীব হায়দার এদের হত্যার পর মুক্ত চিন্তা শব্দটা ভয়ের সমার্থক হয়ে গেছে।
তুই হিন্দু নাস্তিক বলে মুক্ত চিন্তা নামে আল্লাহ, রাসুল, কোরআন নিয়ে গালি দেওয়াকে বৈধতা দিতে চাস। ইসলামে ব্লাসফেমি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ; চিন্তার স্বাধীনতা মানে আল্লাহকে অপমান করার স্বাধীনতা না।
তুমি ভালো ধরেছ মুক্ত চিন্তা বাংলাদেশে শুধু স্লোগান; বাস্তবে যে কেউ ধর্ম, রাজনীতি, gender নিয়ে প্রশ্ন তুলবে, তাকে হয় মামলা, নয় হত্যা, নয় দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।
তুই সব দোষ ধর্মের; কিন্তু মুক্ত চিন্তা মানে সব কিছু বলার অধিকার না। hate speech, defamation, incitement এসব কোথাও বৈধ না। তুই যেটাকে মুক্ত চিন্তা বলছিস, সেটা অনেক সময় অন্যের বিশ্বাসে আঘাত।
ভালো লাগল যে তুমি blogger killing এর historical context এনেছ 2013-2016, একের পর এক মুক্তমনা লেখক, ব্লগার হত্যা; কিন্তু কোনো justice নেই, বরং victim কেই নাস্তিক , ইসলাম বিদ্বেষী বলা হয়েছে।
আল্লাহ মানুষকে বিবেক দিয়েছেন, চিন্তা করার ক্ষমতা দিয়েছেন; কিন্তু সেই চিন্তা আল্লাহর সীমার ভেতরে থাকতে হবে। যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে, রাসুলকে গালি দেয় তাদের মুক্ত চিন্তা ইসলামে গ্রহণযোগ্য না।
তুমি যেভাবে chilling effect দেখিয়েছ যারা বেঁচে আছে, তারা ভয়ে লেখা বন্ধ করেছে, নাম লুকিয়েছে, দেশ ছেড়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি self-censorship এখন norm।
তুই মুক্ত চিন্তা নিয়ে কান্না করিস, কিন্তু পশ্চিমে holocaust denial, hate speech এসব illegal। তাহলে ইসলামের ক্ষেত্রে কেন আলাদা মাপকাঠি?
ভালো হয়েছে যে তুমি DSA ও legal repression ও এনেছ শুধু mob violence না, রাষ্ট্র নিজেই DSA, cyber law দিয়ে মুক্ত চিন্তা কে criminalize করছে।
তোর লেখায় সব atheist, freethinker ই নিরপরাধ victim; কিন্তু অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলিমদের provoke করে, গালি দেয়। freedom of speech মানে freedom to offend না।
তুমি ঠিকই বলেছ মুক্ত চিন্তা শব্দটা এখন বিপজ্জনক label; কেউ নিজেকে freethinker বললে সাথে সাথে নাস্তিক , ধর্মদ্রোহী , জাহান্নামি এই ট্যাগ লাগে।
কিন্তু তুই একবারও বলিস না ধর্মীয় অনুভূতি আছে, সেটাও respect করতে হবে। কেউ যদি আল্লাহকে গালি দেয়, তাহলে মুসলিমরা কষ্ট পাবে, এটা natural।
ভালো লাগল যে তুমি international comparison এনেছ blasphemy law পাকিস্তান, সৌদিতে আছে, কিন্তু বাংলাদেশ সেক্যুলার সংবিধানের দেশ হওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার নামে দমন করছে।
তোর লেখা পড়ে মনে হয়, সব ধার্মিক মানুষই intolerant; কিন্তু অনেক মুসলিম তো ভিন্নমতকে respect করে, dialogue চায়। তুই extreme case নিয়ে generalize করিস।
তুমি যে বলেছ, মুক্ত চিন্তা স্লোগান হয়ে গেছে, কারণ practice করলে জীবন ঝুঁকিতে পড়ে এটা খুবই সত্য। discourse আর risk এর মধ্যে বিশাল gap।
আল্লাহ কিয়ামতে সবার চিন্তা, নিয়ত, কাজ সব বিচার করবেন। তুই মুক্ত চিন্তা বলে আল্লাহকে অস্বীকার করার স্বাধীনতা চাস; কিন্তু আখিরাতে এর শাস্তি ভয়ংকর।
ভালো হয়েছে যে তুমি marketplace of ideas concept এনেছ John Stuart Mill এর theory; কিন্তু বাংলাদেশে marketplace নেই, আছে monopoly যে dominant narrative challenge করবে, তাকে মুছে দেওয়া হয়।
তুই মুক্ত চিন্তা glorify করিস, কিন্তু এটা পশ্চিমা Enlightenment concept; আমাদের সংস্কৃতিতে community, faith, respect এসবের মূল্য বেশি। সব সংস্কৃতিতে একই মডেল কাজ করবে না।
তুমি যেভাবে fear as tool দেখিয়েছ হত্যা, মামলা, গ্রেফতার এসব দিয়ে একটা climate of fear তৈরি করা হয়, যেন মানুষ নিজে নিজেই চুপ থাকে। এটা সবচেয়ে কার্যকর censorship।
ভালো লাগল যে তুমি exile ও diaspora voice ও এনেছ যারা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে, তারা বাইরে থেকে লেখে; কিন্তু দেশের ভেতরে কোনো space নেই।
কিন্তু তুই একবারও বলিস না অনেক প্রগ্রেসিভ মুসলিম scholar, intellectual আছে, যারা ইসলামের ভেতরে থেকে reform, dialogue করছে। শুধু atheist দের মুক্ত চিন্তা না।
তুমি যেভাবে slogan vs. reality juxtaposition করেছ সংবিধানে বাক স্বাধীনতা আছে, কিন্তু বাস্তবে DSA, mob, police সব মিলে সেটা কাগজেই থাকে।
তোর সব লেখায় religion, society এসবকে enemy বানানো হয়; যেন মুক্ত চিন্তা মানে সব tradition, faith ভেঙে ফেলা। এভাবে শুধু বিভাজন তৈরি হয়।
ভালো হয়েছে যে তুমি UN, Amnesty এর statement এনেছ তারাও বলছে, বাংলাদেশে freedom of expression severely restricted; কিন্তু সরকার ধর্মীয় সম্প্রীতি বলে justify করে।
তুই স্লোগান বলে minimize করছিস, কিন্তু অনেক মানুষ তো সত্যিই মুক্ত চিন্তা চর্চা করছে academic, artist, writer। শুধু negative দেখালে পুরো ছবি আসে না।
তুমি যেভাবে martyrs of free thought দেখিয়েছ আভিজিৎ, নিলয়, ওয়াশিকুর এদের নাম মনে রাখা দরকার, যেন তাদের sacrifice ভুলে না যাই।
ভালো লাগল যে তুমি double bind concept এনেছ যদি চুপ থাকো, তাহলে complicit; যদি কথা বলো, তাহলে target। কোনো safe option নেই যারা সত্যিই মুক্ত চিন্তা করতে চায়।